বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের অস্থিরতার মাঝে দেশীয় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং সীমান্ত দিয়ে তেল পাচার রোধে যুদ্ধংদেহী অবস্থান নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও কোনো অসাধু চক্রকে সাধারণ মানুষের পকেট কাটতে দেওয়া হবে না। শনিবার বিকেলে সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত সরকারি দলীয় সংসদীয় কমিটির বৈঠকে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে সারা দেশে চিরুনি অভিযান চালানোর এবং চোরাচালান রোধে কঠোরতম ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
বৈঠক শেষে সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে তার প্রভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার সর্বোচ্চ সচেষ্ট। বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা চলছে। কিন্তু গোয়েন্দা তথ্যে উঠে এসেছে যে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও পাচারকারী চক্র এই সুযোগে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লুটছে এবং সীমান্ত দিয়ে তেল পাচার করছে।
মজুত পর্যাপ্ত, আতঙ্কের কারণ নেই
সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানানো হয়েছে যে, জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত ঘাটতি দেশে নেই। চিফ হুইপ জানান, ইতোমধ্যে ২ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেলবাহী জাহাজ বন্দরে নোঙর করেছে এবং সমপরিমাণ আরও একটি চালান বাংলাদেশের পথে রয়েছে। ফলে সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা নেই।
প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের (এমপি) নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা নিজ নিজ এলাকায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখেন। বিশেষ করে ডিলার বা খুচরা বিক্রেতারা যাতে অপ্রয়োজনে তেল মজুত করে দাম বাড়াতে না পারে, সেদিকে কড়া নজরদারি রাখতে বলা হয়েছে। আগামীকাল সংসদ অধিবেশনে জ্বালানি মন্ত্রী এ বিষয়ে ৩০০ বিধিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেবেন, যা জনগণের বিভ্রান্তি দূর করতে সহায়ক হবে।
জবাবদিহিতায় নতুন দৃষ্টান্ত
এবারের সংসদীয় কমিটির বৈঠকে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের মন্ত্রীদের নির্দেশ দিয়েছেন যাতে তারা সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ এলাকার উন্নয়ন ও সংকট সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য দিয়ে নিয়মিত অবহিত করেন। চিফ হুইপ বলেন, বাংলাদেশে এটিই প্রথম যেখানে প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রীদের বাধ্য করেছেন এমপিদের কাছে রিপোর্ট করতে, যাতে তারা এলাকাভিত্তিক দ্রুত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারেন। এখন থেকে প্রতি মাসে এ ধরনের ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হবে।
দুর্ঘটনা ও শোক প্রস্তাব
বৈঠকের শুরুতে স্পিকারের সহধর্মিণীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ ও মোনাজাত করা হয়। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কিছু বাস ও ট্রেন দুর্ঘটনা নিয়ে বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং ভবিষ্যতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা সংসদীয় কমিটির কাছে তাদের গৃহিত পদক্ষেপগুলো তুলে ধরেন। পরিবহণ খাতের বিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইনি কাঠামোর বিষয়েও আলোচনা হয়।
সংসদীয় কার্যক্রমের অগ্রগতি
সংরক্ষিত নারী আসন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিল নিয়ে আগামী ৩০ মার্চের মধ্যে রিপোর্ট পেশ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সংসদীয় কমিটি। এছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন নিয়ে আগামীকাল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়েছেন যেন সংসদের প্রতিটি কর্মকাণ্ড স্বচ্ছ এবং জনবান্ধব হয়।
জ্বালানি তেলের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই সরাসরি হস্তক্ষেপ মূলত বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং জনরোষ এড়ানোর একটি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে শুরু হতে যাওয়া চিরুনি অভিযান কতটুকু সফলভাবে চোরাচালান সিন্ডিকেট ভাঙতে পারে।

