মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ আর যুদ্ধের দামামা এখন আর কেবল দূরদেশের খবর নয়; সেই সংঘাতের আঁচ এসে লেগেছে বাংলাদেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ঘরেও। চলমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা আর পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে এ পর্যন্ত পাঁচজন বাংলাদেশি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছেন। শুক্রবার সকালে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত মোশারফ হোসেনের মরদেহ দেশে ফেরার পর এই করুণ পরিসংখ্যান সামনে আসে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তখন এক শোকাতুর পরিবেশ।
সকাল ১০টা ৫০ মিনিট। সৌদি এয়ারলাইনসের এসভি-৮০৬ ফ্লাইটটি যখন রানওয়ে স্পর্শ করল, তখন বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে অপেক্ষমাণ স্বজনদের চোখে কেবলই জল। কফিনে মোড়ানো মোশারফ হোসেনের নিথর দেহটি গ্রহণ করতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন সরকারের উচ্চপদস্থ মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা। এই মৃত্যু কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন ভঙ্গের প্রতিচ্ছবি। গত ৮ মার্চ সৌদি আরবের আল-খারিজ শহরের কাছে আল-তোয়াইক এলাকায় ইফতারের আগমুহূর্তে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় প্রাণ হারান মোশারফ।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে জানান, মধ্যপ্রাচ্যের এই অসম যুদ্ধে এ পর্যন্ত আমরা আমাদের পাঁচজন ভাইকে হারিয়েছি। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনার। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, বর্তমানে যারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন যুদ্ধকবলিত এলাকায় রয়েছেন, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের এখন প্রধান অগ্রাধিকার। পরিস্থিতি যেদিকেই মোড় নিক না কেন, সরকার প্রতিটি বাংলাদেশির পাশে থাকবে।
সরকার কেবল মরদেহ গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছে না, বরং যারা ওই অঞ্চলে আটকা পড়ে আছেন তাদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও শুরু করেছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, ইরান থেকে ১৮৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে আজারবাইজান হয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। যারা স্বেচ্ছায় ফিরতে চাইছেন, তাদের পর্যায়ক্রমে ফিরিয়ে আনা হবে। আমাদের মিশনগুলো প্রবাসীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে। তবে বাংলাদেশ সবসময়ই চায় যুদ্ধ নয়, বরং আলোচনা ও কূটনীতির মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান হোক।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, প্রধানমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে যেন কোনো প্রবাসী এই বিপদের সময়ে নিজেকে একা মনে না করেন। তিনি ঘোষণা দেন, নিহত মোশারফের পরিবারের পাশে সরকার দাঁড়াচ্ছে। তার দুই সন্তানের পড়াশোনার সমস্ত দায়িত্ব নেবে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বিএমইটি কার্ডধারী হিসেবে তার পরিবার মোট ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা সরকারি অনুদান পাবে।
যুদ্ধের কারণে অনেক প্রবাসীই কর্মস্থল ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হচ্ছেন। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী আশ্বাস দেন যে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যারা আবার কাজে ফিরতে চাইবেন, তাদের ভিসার মেয়াদ বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান পুনর্বহালে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। যারা দেশেই থেকে যেতে চান, তাদের জন্যও বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো।
নিহত মোশারফ হোসেনের বাড়ি টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার কীর্তনখোলা গ্রামে। সাধারণ কৃষক পরিবারের সন্তান মোশারফ ভাগ্য বদলাতে পাড়ি জমিয়েছিলেন মরুভূমির দেশে। কিন্তু সেই মরুভূমিই শেষ পর্যন্ত তার শেষ শয্যা হয়ে দাঁড়াল। বিমানবন্দরে উপস্থিত মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে মোশারফের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়, যা পরে অ্যাম্বুলেন্সযোগে তার গ্রামের বাড়িতে পাঠানো হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা যেন ক্রমশ দীর্ঘতর হচ্ছে। ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে বাড়তে থাকা এই উত্তেজনার বলি হচ্ছেন মোশারফের মতো সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো। বাংলাদেশের অর্থনীতি যাদের রেমিট্যান্সে সচল থাকে, আজ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও বড় আকারের উদ্ধার অভিযান চালানো হবে।
এদিকে বিমানবন্দরে উপস্থিত পরিবারের সদস্যরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা কেবল তাদের প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আশা করেছিলেন, কিন্তু ফিরে পেলেন একটি কাঠের কফিন। এই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল, বিদেশের মাটিতে একেকটি প্রাণ ঝরে যাওয়ার পেছনে লুকিয়ে থাকে একেকটি পরিবারের নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার গল্প। সরকারি সহায়তা হয়তো কিছুটা আর্থিক স্বস্তি দেবে, কিন্তু স্বজন হারানোর ক্ষত কি মোছা সম্ভব?
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কেবল সৌদি আরব বা ইরান নয়, লেবানন ও সিরিয়া সীমান্তে থাকা বাংলাদেশিদের ব্যাপারেও নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের বিশাল শ্রমবাজার থাকায় এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তবে আপাতত প্রাণের সুরক্ষাই বড় কথা।
শামা ওবায়েদ ইসলাম তার বক্তব্যের শেষে আবারও জোর দিয়ে বলেন, বাংলাদেশ কোনো যুদ্ধ চায় না। যুদ্ধের বিভীষিকা আমরা জানি। আমরা চাই দ্রুত শান্তি ফিরে আসুক। আমাদের প্রবাসী ভাই-বোনদের নিরাপত্তা দিতে আমরা যা যা করার প্রয়োজন, তার সবটুকুই করব। আমাদের সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় এই সংকটে একযোগে কাজ করছে।
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে যখন ক্ষেপণাস্ত্রের আলো জ্বলে ওঠে, তখন সখীপুরের মতো হাজারো গ্রামের ঘরে ঘরে শুরু হয় উৎকণ্ঠা। মোশারফের মরদেহ সেই উৎকণ্ঠার এক করুণ সমাপ্তি। এখন সরকারের চ্যালেঞ্জ হলো, বাকি চারজন নিহতের পরিবারকে যথাযথ সহায়তা দেওয়া এবং যারা এখনো যুদ্ধক্ষেত্রে রয়ে গেছেন, তাদের নিরাপদে বাংলার মাটিতে ফিরিয়ে আনা।

