দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার ও জনবল নিয়োগের একগুচ্ছ নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। রোববার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানান, সারাদেশে ৯ হাজার ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের বিশাল এক উদ্যোগ হাতে নিয়েছে সরকার। তবে নিয়োগের যোগ্যতা ও সনদের আইনি জটিলতায় প্রক্রিয়াটি কিছুটা থমকে থাকলেও, দ্রুতই সব বাধা কাটিয়ে নিয়োগ সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
রোববার বেলা ১১টায় স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এই ৯ হাজার শিক্ষকের মধ্যে ‘কারিআনা’ পাসধারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তবে কেবল ইসলাম ধর্ম নয়, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানসহ সব ধর্মের শিক্ষকদের সমান গুরুত্ব দিয়ে নিয়োগ দেওয়া হবে যাতে প্রতিটি শিক্ষার্থী নিজ নিজ ধর্মীয় নৈতিক শিক্ষা সঠিকভাবে পায়।
সংসদ অধিবেশনে শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত দেন মন্ত্রী। এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বিগত সরকারের আমলে চালু হওয়া ‘ভর্তি লটারি’ পদ্ধতির কড়া সমালোচনা করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, মেধাবীদের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে লটারি প্রথা তার কাছে মোটেও যুক্তিসঙ্গত মনে হয়নি। আগামী শিক্ষাবর্ষে ভর্তির ক্ষেত্রে মেধা যাচাইয়ের পুরনো বা নতুন কোনো কার্যকর পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা যায় কি না, তা নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে শিগগিরই আলোচনায় বসবে মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে দেশের বিভিন্ন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক সুতায় বাঁধার বিষয়টিও। বিশেষ করে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোর ওপর সরকারি নজরদারি বাড়ানো এবং ইবতেদায়ী ও কওমী মাদরাসাসহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত জাতীয় কাঠামোর আওতায় আনার কাজ চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। সরকারের লক্ষ্য হলো—যে যে মাধ্যমেই পড়ুক না কেন, সবার জন্য শিক্ষার মান এবং সুযোগ যেন সমান হয়।
সংসদ সদস্য এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী দেশের উচ্চশিক্ষার বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে ৫৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সচল রয়েছে। তবে যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় না বাড়িয়ে, এলাকার প্রয়োজনীয়তা এবং সক্ষমতা বিবেচনা করে নতুন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিষয়টি দেখা হবে। শিক্ষার প্রসারে সংখ্যার চেয়ে মানের ওপর বেশি জোর দেওয়ার পক্ষপাতী বর্তমান প্রশাসন।
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবি ‘এমপিওভুক্তি’ নিয়েও সুখবর দিয়েছেন মন্ত্রী। তিনি জানান, নতুন করে এমপিওভুক্তির জন্য শিগগিরই আবেদন আহ্বান করা হবে। তবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পুরনো আবেদনগুলো আবারও গুরুত্বের সাথে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যারা প্রকৃতপক্ষে যোগ্য এবং সব শর্ত পূরণ করেছে, তারাই এই সুবিধার আওতায় আসবে। এতে করে প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার মান আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষামন্ত্রীর এই ঘোষণাগুলো দেশের ঝিমিয়ে পড়া শিক্ষা প্রশাসনে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে বেকার ধর্মপ্রাণ শিক্ষিত যুবকদের মাঝে ৯ হাজার পদের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, লটারি পদ্ধতির বিলুপ্তি এবং ভর্তি পরীক্ষা ফেরার খবরে স্বস্তি ফিরেছে অভিভাবক ও সচেতন মহলে। তারা মনে করছেন, মেধার লড়াই ছাড়া প্রকৃত মেধা বিকাশ সম্ভব নয়।
জাতীয় সংসদের এই অধিবেশনে মন্ত্রীর সাবলীল ও স্পষ্ট বক্তব্য এটাই প্রমাণ করে যে, সরকার শিক্ষাখাতকে ঢেলে সাজাতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে কারিআনা পাসধারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়া এবং মাদরাসা শিক্ষাকে মূলধারার সাথে সমন্বিত করার পদক্ষেপটি দূরদর্শী বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। এখন দেখার বিষয়, এই বিশাল নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং ভর্তি পদ্ধতির পরিবর্তন কত দ্রুত দৃশ্যমান হয়।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই নতুন পথচলা দেশের তৃণমূল থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এক বিশাল পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ এবং ভর্তি পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা ফিরলে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আরও দক্ষ হয়ে গড়ে উঠবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্ট সকলে। রোববারের এই সংসদীয় আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সামনের দিনগুলোতে শিক্ষাখাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে।

