আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বড় ঘোষণা দিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। আগামী ১৫ মার্চ থেকে গণপরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে তেলের দাম বাড়ছে না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মন্ত্রী, যা সাধারণ যাত্রী ও পরিবহন মালিকদের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে এসেছে।
শুক্রবার (১৩ মার্চ) সকালে রাজধানীর প্রধান রেলওয়ে স্টেশনে ঈদযাত্রার প্রথম দিনের সার্বিক পরিস্থিতি পরিদর্শন করতে এসে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী জানান, জ্বালানি মন্ত্রীর পক্ষ থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, সরবরাহে কোনো ঘাটতি থাকবে না। ফলে জ্বালানির অজুহাতে গণপরিবহনের ভাড়া বৃদ্ধি বা কৃত্রিম পরিবহন সংকটের কোনো সুযোগ নেই।
রেল যোগাযোগে আমূল পরিবর্তনের অঙ্গীকার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, সরকার রেল ব্যবস্থাকে আধুনিক, যুগোপযোগী এবং জনবান্ধব করতে বদ্ধপরিকর। লক্ষ্য একটাই—মানুষ যেন খুব অল্প সময়ে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে পারে। রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে সরকার যে মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তার সুফল যাত্রীরা পেতে শুরু করেছেন বলে তিনি দাবি করেন।
তবে যাত্রীসেবার মান আরও বাড়াতে নতুন কোচ, ইঞ্জিন এবং উন্নত বাস ও নৌযান যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিশেষ করে বাস ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা দূর করে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামো দাঁড় করানোর ওপর জোর দিচ্ছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রীর মতে, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থাই হবে স্মার্ট বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি।
কোটি মানুষের ঈদযাত্রার চ্যালেঞ্জ ও প্রস্তুতি
ঈদের ছুটিতে ঢাকা ছাড়ার বিশাল কর্মযজ্ঞকে বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, মাত্র দুই থেকে তিন দিনের ব্যবধানে ঢাকা থেকে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ থেকে দেড় কোটি মানুষ গ্রামের উদ্দেশে রওনা হন। পৃথিবীর খুব কম শহরেই এত অল্প সময়ে এত বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত দেখা যায়।
এই বিশাল চাপ সামলানো অত্যন্ত কঠিন হলেও সরকার সবটুকু সামর্থ্য দিয়ে তা মোকাবিলা করছে। মন্ত্রী জানান, পরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে এরই মধ্যে বাড়তি কোচ ও বাসের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথ—তিন মাধ্যমেই সমন্বিত তদারকি জোরদার করা হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে না হয়।
লোকোমোটিভ সংকট ও শিডিউল বিপর্যয় রোধে পদক্ষেপ
ট্রেনের শিডিউল বজায় রাখা নিয়ে প্রতি বছরই সাধারণ মানুষের মাঝে উদ্বেগ থাকে। এ বিষয়ে রেলপথমন্ত্রী বলেন, বড় কোনো শিডিউল বিপর্যয় এড়াতে আমাদের অন্তত ৮৫ থেকে ৮৭টি লোকোমোটিভ বা ইঞ্জিনের প্রয়োজন। বর্তমানে ৭৮টি লোকোমোটিভ সচল রয়েছে এবং বহরে যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি আশাবাদী যে, আগামী দুই দিনের মধ্যে আরও কয়েকটি ইঞ্জিন যুক্ত হলে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। লোকোমোটিভের সংখ্যা বাড়লে ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা রক্ষা করা অনেক সহজ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। যাত্রীদের দীর্ঘক্ষণ স্টেশনে অপেক্ষা করার ভোগান্তি কমাতে কারিগরি টিমগুলো সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে পথঘাট
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, রেলওয়ে পুলিশের পাশাপাশি জেলা পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ এবং নৌ-পুলিশ একযোগে মাঠে কাজ করছে। এমনকি নিরাপত্তার খাতিরে আনসার সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
শৃঙ্খলার জন্য বিশেষ জ্যাকেট পরিহিত একদল স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যারা স্টেশনের প্রতিটি ৪০০ মিটার পরপর অবস্থান করবেন। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা বা দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য রুখতে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে। মন্ত্রীর আশ্বাস, সাধারণ মানুষ যেন নিরাপদে পরিবারের কাছে পৌঁছাতে পারেন, সেজন্য সরকার সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
পরিদর্শনকালে মন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে মন্ত্রী কড়া বার্তা দেন যে, যাত্রীসেবায় কোনো ধরনের অবহেলা বরদাশত করা হবে না।

