দেড় দশকের জগদ্দল পাথরসম ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অবিনশ্বর মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন রাষ্ট্রপতি। বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, হাজারো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজ এক তাবেদারমুক্ত ও নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলো।
অধিবেশনের শুরুতেই রাষ্ট্রপতি নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেন যে, একটি শান্তিপূর্ণ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই সংসদ গঠিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
রাষ্ট্রপতি তার ভাষণে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, এই বিপ্লবে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন এবং পাঁচ শতাধিক মানুষ তাদের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, শহীদদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। সরকার ইতিমধ্যে আহতদের চিকিৎসার জন্য ১২৪৩টি বিশেষ স্বাস্থ্য কার্ড প্রদান করেছে এবং গুরুতর আহত ১৩৭ জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠিয়েছে।
শহীদদের স্মৃতি অম্লান রাখতে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের ৬৪টি জেলায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং ঢাকায় একটি অত্যাধুনিক ‘জুলাই অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ স্থাপনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। এটি আগামীর প্রজন্মকে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা দেবে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানের কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং এর সুরক্ষায় বেগম জিয়ার আপসহীন নেতৃত্ব চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশ এখন একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে রাষ্ট্রপতি এক আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অস্থিরতা কাটিয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটা স্থিতিশীল হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি কমে ৮.৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের ফলে এই হার সামনে আরও কমবে।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিষয়ে রাষ্ট্রপতি জানান, ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪.৭৮ বিলিয়ন ইউএস ডলারে উন্নীত হয়েছে। এটি দেশের অর্থনীতির শক্তিশালী অবস্থানেরই প্রতিফলন। এছাড়া ব্যাংক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পুঁজিবাজারের বিশৃঙ্খলা বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন যে, ব্যাংক খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে একটি শক্তিশালী ‘অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন’ গঠন করা হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজারের অনিয়ম ও জালিয়াতি তদন্তে একটি পৃথক কমিশন গঠন করা হবে, যারা বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলের সব লুটপাটের বিচার নিশ্চিত করবে।
তার এই দীর্ঘ ভাষণের সময় সংসদে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেলেও, রাষ্ট্রপতি তার বক্তব্যে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি সকল সদস্যকে প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে দেশ গঠনে মনোযোগী হওয়ার আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, রাষ্ট্রপতির এই ভাষণটি ছিল একই সাথে শোকাতুর এবং স্বপ্নাতুর। যেখানে একদিকে বিপ্লবের ক্ষতবিক্ষত ইতিহাস উঠে এসেছে, অন্যদিকে একটি শক্তিশালী অর্থনীতির রোডম্যাপও দেওয়া হয়েছে। এখন এই রূপরেখা বাস্তবায়নে সংসদ কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখে, সেটিই দেখার বিষয়।

