ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম দিনেই এক নজিরবিহীন উত্তাপের সাক্ষী হলো দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। রাষ্ট্রপতির প্রথাগত ভাষণ শুরু হতেই তা বর্জন করে সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। পরে সংসদ ভবনের বাইরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ‘তিনটি সুনির্দিষ্ট অপরাধের’ অভিযোগ তুলে ধরেন।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) বিকেলে সংসদ অধিবেশন চলাকালে রাষ্ট্রপতি যখন তার ভাষণ শুরু করেন, তখনই বিরোধীদলীয় সদস্যরা কক্ষ ত্যাগ করেন। ওয়াকআউট শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ডা. শফিকুর রহমান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বর্তমান রাষ্ট্রপতির সমালোচনা করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, এই মহান সংসদে একজন ‘ফ্যাসিস্টের দোসরের’ বক্তব্য শোনা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “এই সংসদ জুলাই বিপ্লবের শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা আগেই অনুরোধ করেছিলাম, কোনো খুনির দোসর যেন এই পবিত্র সংসদের মঞ্চে বক্তব্য রাখার সুযোগ না পায়। কিন্তু আমাদের সেই দাবি উপেক্ষা করা হয়েছে।” তিনি রাষ্ট্রপতির ভাষণ বর্জনের পেছনে তিনটি সুনির্দিষ্ট কারণ বা ‘অপরাধ’ ব্যাখ্যা করেন।
প্রথম অভিযোগ তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতি বিগত শাসনের সব গুম ও খুনের সহযোগী ছিলেন। ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রতিটি অন্যায়ের সময় তিনি নীরব থেকে বা পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে গেছেন, যা তাকে অপরাধের অংশীদার করে তুলেছে।
দ্বিতীয় কারণ হিসেবে তিনি ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ৫ আগস্টের ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “৫ আগস্ট তিনি জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে বলেছিলেন যে, তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি গণমাধ্যমে সেই কথা অস্বীকার করে জাতির সামনে মিথ্যাবাদী হিসেবে সাব্যস্ত হয়েছেন। একজন মিথ্যাবাদীকে আমরা রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে এই সংসদে সম্মান দিতে পারি না।”
তৃতীয়ত, তিনি একটি সাংবিধানিক অসংগতির কথা তুলে ধরেন। জামায়াত আমিরের দাবি অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নিজেই একটি অধ্যাদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন যেখানে বলা ছিল—সংসদ সদস্যরা একইসাথে ‘সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন। একই দিনে উভয় পদের শপথ হওয়ার কথা থাকলেও বিরোধী দল তা পালন করেছে কিন্তু সরকারি দল তা গ্রহণ করেনি। রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষরিত অধ্যাদেশের এমন লঙ্ঘন ও দ্বিমুখী অবস্থানকে তিনি বড় ধরনের বিচ্যুতি হিসেবে আখ্যা দেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “জুলাইয়ের বিপ্লবে যারা প্রাণ দিয়েছে, তাদের রক্তের সাথে বেইমানি করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যে ব্যক্তি স্বৈরাচারকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছেন এবং পরে জনগণের কাছে মিথ্যা বলেছেন, তার মুখ থেকে নীতিবাক্য শোনা এই সংসদের জন্য অবমাননাকর।”
সংসদ ভবন এলাকায় বিরোধীদলীয় নেতার এই বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক বৈধতা এবং তার অতীত ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক ঝুলে ছিল, বিরোধী দলের এই অবস্থান তা আরও উসকে দিয়েছে।
অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতির ভাষণ চলাকালীন বিরোধী দলের আসনগুলো খালি থাকায় এক ধরনের শূন্যতা অনুভূত হচ্ছিল। যদিও সরকারি দলের সদস্যরা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন, কিন্তু ডা. শফিকুর রহমানের তোলা ‘নৈতিক ও আইনি’ প্রশ্নগুলো সংসদের প্রথম দিনের আবহকে বেশ গম্ভীর করে তুলেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে বিরোধী দলের এই অবস্থান আগামী দিনগুলোতে সংসদের ভেতরে ও বাইরে উত্তাপ ছড়াতে পারে। এটি কেবল একটি ভাষণ বর্জন নয়, বরং রাষ্ট্রপতির পদের প্রতি বিরোধী দলের আস্থাহীনতারই বহিঃপ্রকাশ।

