ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আজ এক বিশেষ মুহূর্তের সাক্ষী হলো, যখন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বর্তমান সংসদকে কোনো সাধারণ বা গতানুগতিক সংসদ নয়, বরং ‘২৪-এর বিপ্লবের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক বিশেষ সংসদ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
বৃহস্পতিবার দুপুরে নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন। ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে গত দেড় দশকের দুঃশাসন, গুম এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বীরত্বগাথা তুলে ধরে সংসদের পবিত্রতা রক্ষার আহ্বান জানান।
বক্তব্যের শুরুতেই মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তিনি স্মরণ করেন দেশের ইতিহাসের সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের। ১৯৪৭, ’৫২, ’৭১, ’৭৫ এবং ৯০-এর গণ-অভ্যুত্থানের উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি বিশেষভাবে ঋণী সেইসব ভাইদের প্রতি, যারা গত সাড়ে ১৫ বছর আয়নাঘরের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি ছিলেন, যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন এবং যারা ২০২৪-এর জুলাইয়ে অকাতরে প্রাণ দিয়ে আমাদের এই সংসদে কথা বলার সুযোগ করে দিয়েছেন। তাদের এই ঋণ শোধ করার সাধ্য আমাদের নেই।”
অতীতের সংসদীয় ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করে ডা. শফিকুর রহমান স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন, “স্বাধীনতার ৫৫ বছরে আমরা খুব কম সময়ই কার্যকর সংসদীয় রাজনীতি দেখেছি। বেশিরভাগ সময় দেশ ছিল ফ্যাসিবাদের কবলে। সংসদ ভবনকে কেবল একটি ‘ডামি’ সংসদে রূপান্তর করা হয়েছিল, যেখানে জনগণের অধিকারের ওপর কোনো সুবিচার করা হয়নি।”
তিনি স্পিকারের নিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, “আপনি আজ একটি নির্দিষ্ট দল থেকে নির্বাচিত হয়ে এলেও স্পিকারের চেয়ারে বসার পর দলীয় পরিচয় ত্যাগ করেছেন। ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা—আপনার কাছে সরকারি দল বা বিরোধী দল বলে আলাদা কিছু থাকবে না। আমরা আপনার কাছ থেকে কেবল ‘ইনসাফ’ বা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি।”
সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখার ওপর জোর দিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুরোধ জানান। তিনি বলেন, “অতীতে আমরা দেখেছি, এই পবিত্র সংসদকে মানুষের চরিত্র হননের কেন্দ্র বানানো হয়েছিল। জনগণের সমস্যা নিয়ে আলোচনার চেয়ে ব্যক্তিগত কাদা ছোড়াছুড়িতেই বেশি সময় নষ্ট হতো। আমি বিনীতভাবে বলব, এই সংসদ যেন কারো অপমানের কেন্দ্রে পরিণত না হয়। এটি হোক কেবল জনকল্যাণের সূতিকাগার।”
জুলাই বিপ্লবের সেই প্রকম্পিত স্লোগান ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ (আমরা বিচার চাই)-এর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের তিনটি প্রধান অঙ্গের মধ্যে সংসদই হলো প্রাণ। সংসদ যদি সঠিকভাবে চলে, তবে নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগও সঠিক পথে চলতে বাধ্য হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, নতুন স্পিকারের নেতৃত্বে সমাজ থেকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব ধরনের অসংগতি ও দুর্নীতির অবসান ঘটবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানান এবং ঘোষণা করেন যে, সংসদের প্রতিটি গঠনমূলক কাজে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। তার এই ভারসাম্যপূর্ণ ও তেজস্বী বক্তব্য সংসদ কক্ষে এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির আভাস দেয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ডা. শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য জুলাই বিপ্লবের চেতনাকে সংসদীয় কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করার একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ। প্রতিহিংসার রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার এই আহ্বান দেশের আগামীর রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলবে।

