শুক্রবার রাতের অন্ধকার কেটে শনিবারের কড়া রোদ উঠলেও পাল্টায়নি রাজধানীর ফিলিং স্টেশনগুলোর দৃশ্যপট। বরং সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তেলের জন্য অপেক্ষারত মানুষের সারি আর দীর্ঘশ্বাস। কল্যাণপুরের খালেক স্টেশন সার্ভিস পাম্পে গত রাতে দুই ঘণ্টা দাঁড়িয়েও এক ফোঁটা পেট্রোল পাননি ব্যবসায়ী আল আমিন। আজ সকালে আবারও লাইনে দাঁড়িয়ে আড়াই ঘণ্টা পর যখন তার হাতে তেল এলো, দেখা গেল বরাদ্দ মিলেছে মাত্র দুই লিটার।
ব্যবসায়িক কাজে বের হওয়া আল আমিনের চোখেমুখে এখন কেবলই বিরক্তি। ক্ষোভ ঝেরে তিনি বলেন, “শহরের ছোট ছোট পাম্পগুলো প্রায় সব বন্ধ। বড় পাম্পগুলোর সামনে এক কিলোমিটারেরও বেশি লম্বা লাইন। মাত্র দুই লিটার তেলের জন্য এই নরকযন্ত্রণা সহ্য করা যায় না। সরকার তেল কেনার ওপর সীমা বেঁধে দিয়ে উল্টো আতঙ্ক আর ভোগান্তি বাড়িয়ে দিয়েছে।”
রাজধানীর আসাদগেট, কল্যাণপুর, টেকনিক্যাল এবং তেজগাঁও এলাকার অন্তত ১১টি পাম্প ঘুরে দেখা গেছে এক অভূতপূর্ব বিশৃঙ্খলা। অধিকাংশ পাম্পেই ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে অথবা কর্মচারীরা হাত নেড়ে যানবাহন ফিরিয়ে দিচ্ছেন। যেসব পাম্প খোলা আছে, সেখানে তেলের জন্য হাহাকার এতটাই যে, অনেক জায়গায় চালকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটছে।
আসাদগেটের তালুকদার পাম্পে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেল চালক সাইফুল ইসলাম সরাসরি আঙুল তুললেন সিন্ডিকেটের দিকে। তার মতে, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা চলছে। সাইফুল বলেন, “মজুতদাররা তেল আটকে রেখেছে, আর সরকার সরবরাহ ঠিক না করে উল্টো তেল কেনায় লিমিট দিয়ে সাধারণ মানুষকে ভয়ের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এখন সবাই ভাবছে আসলেই বোধহয় দেশে তেল নেই।”
সংকটের প্রভাব কেবল পেট্রোল বা অকটেনে সীমাবদ্ধ নেই, তা ছড়িয়ে পড়েছে সিএনজি স্টেশনগুলোতেও। তেলের লাইনে জায়গা না পেয়ে অনেক প্রাইভেটকার চালক গ্যাসের দিকে ঝুঁকছেন। মঞ্জুরুল ইসলাম নামে এক চালক আক্ষেপ করে বলেন, “তেল পাচ্ছি না বলে গ্যাসের লাইনে আসলাম, এখানেও একই দশা। তেলের গাড়িগুলো গ্যাসের লাইনে ঢুকে পড়ায় এখানেও জট লেগে গেছে।”
শ্যামলীর সাহিল ফিলিং স্টেশনের চিত্র আরও করুণ। সেখানে মজুত থাকা সত্ত্বেও ভিড় সামলাতে না পেরে বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে। পাম্প কর্মচারী মেহেদি জানান, গতকাল বিকেল পর্যন্ত তারা তেল দিয়েছেন, কিন্তু এরপর সরবরাহ শেষ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “তেল নেই বললেও মানুষ লাইন ছাড়ছে না। এই ভিড়ের কারণে যারা গ্যাস নিতে আসছেন, তারাও বিড়ম্বনায় পড়ছেন।”
পাম্প কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের ওপর যে পরিমাণ চাপ সৃষ্টি হয়েছে তা সামলানোর মতো সক্ষমতা কোনো স্টেশনেরই নেই। খালেক স্টেশনের কর্মী সুমন জানান, তাদের কাছে তেলের গাড়ি লোড করা আছে ঠিকই, কিন্তু যে হারে মানুষ আসছে তাতে ২০টি নজেল থাকলেও কুলিয়ে ওঠা সম্ভব হতো না। মাত্র দুটি নজেল দিয়ে শত শত বাইকের চাপ সামলাতে তারা হিমশিম খাচ্ছেন।
এদিকে, সড়কের এই বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে কালঘাম ছুটছে ট্রাফিক পুলিশের। রাস্তার ওপর মাইলের পর মাইল গাড়ির লাইন থাকায় সাধারণ যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাফিক কর্মকর্তা বলেন, “গত দুদিন ধরে আমাদের মূল কাজের চেয়ে পাম্পের লাইন ঠিক রাখতেই বেশি সময় যাচ্ছে। আমরা বাইকারদের জন্য আলাদা লাইন করার চেষ্টা করছি, কিন্তু আগামীকাল অফিস খোলার দিন পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।”
সরকার বারবার বলছে দেশে জ্বালানি সংকটের কোনো কারণ নেই, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাস্তব চিত্র আর সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে অন্য কিছু। সরবরাহ ব্যবস্থাপনা আর মজুতদারদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে এই দীর্ঘ লাইন আরও প্রলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন ভুক্তভোগীরা।

