মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের ঘনঘটা আর বারুদের ঘ্রাণে হাজার মাইল দূরে অবস্থিত বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামের জনজীবনেও অস্থিরতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শনিবার সকাল থেকেই বন্দরনগরীর অলিগলির ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা গেছে যানবাহনের অন্তহীন সারি। সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট আর আকাশচুম্বী দাম বাড়ার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরণের হাহাকার তৈরি হয়েছে।
শহরের প্রাণকেন্দ্র গণি বেকারি মোড় থেকে শুরু করে বহদ্দারহাট পর্যন্ত প্রতিটি স্টেশনেই গাড়ির জটলা এখন নিত্য দৃশ্য। ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে শুরু করে মোটরবাইক—সবারই লক্ষ্য একটাই, আগেভাগে ট্যাংক পূর্ণ করে নেওয়া। এই বাড়তি চাপের কারণে পাম্পের কর্মচারীরা হিমশিম খাচ্ছেন, আর রাজপথের যানজট ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশের সংযোগ সড়কগুলোতে।
সকাল সাড়ে দশটার দিকে কিউসি ট্রেডিং লিমিটেড ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, লাইনের শেষ মাথাটি মূল সড়ক ছাড়িয়ে অনেক দূরে চলে গেছে। ট্রাক চালক রহিম মিয়া প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছেন। তার চোখেমুখে অনিশ্চয়তার ছাপ। রহিম বলেন, “টিভিতে দেখলাম মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লাইগা গেছে। যদি তেল আসা বন্ধ হয়া যায়, তাইলে তো আমাগো রুটি-রুজি সব শেষ।”
এমন শঙ্কা কেবল রহিমের একার নয়। পাঁচলাইশ, ষোলশহর এবং অক্সিজেন মোড় এলাকার পাম্পগুলোতেও একই চিত্র। মানুষের এই ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত কেনাকাটার ফলে অনেক পাম্পে মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। যদিও তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দাবি করছে, তাদের ভাণ্ডারে পর্যাপ্ত জ্বালানি জমা আছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) বারবার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছে যে, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। বিপিসির একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, আগামী কয়েক মাসের জন্য প্রয়োজনীয় মজুত নিশ্চিত করা আছে। সাধারণ মানুষকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের গুজবে কান না দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছে।
যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. আমীর মাসুদ অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন, “বাজারে তেলের সরবরাহ একদম স্বাভাবিক। সংকটের কথাটি স্রেফ রটনা। এই মুহূর্তে আমাদের ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে, তাই আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।”
পদ্মা অয়েল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমানও একই সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, সরকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সরবরাহ চেইনে কোনো বিঘ্ন ঘটেনি। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “সবাই যদি একসাথে বাড়তি তেল কেনা শুরু করে, তবে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে। আমাদের ধৈর্য ধরা উচিত।”
মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি অবশ্য ভিন্ন কথা বলছে। চান্দগাঁও এলাকার একটি পাম্পের অপারেটর সেলিম উল্লাহ জানান, স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এখন দেড় থেকে দুইগুণ বেশি গাড়ি আসছে। সবাই সরাসরি ‘ফুল ট্যাংক’ করতে চাচ্ছে। আগে যেখানে একজন চালক ৫০০ টাকার তেল নিতেন, এখন তিনি নিচ্ছেন দুই হাজার টাকার।
বর্তমানে চট্টগ্রামে প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা এবং পেট্রোল ১১৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দাম এখন পর্যন্ত বাড়েনি, কিন্তু চালকদের আশঙ্কা—আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে দেশীয় বাজারেও এর প্রভাব পড়বে মুহূর্তেই। এই আশঙ্কাই মূলত তেলের পাম্পগুলোকে জনসমুদ্রে পরিণত করেছে।
নগরের নতুন ব্রিজ এলাকার এক বেসরকারি চাকরিজীবী তার বাইকে তেল নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রায় এক ঘণ্টা ধরে। তিনি বিরক্তি নিয়ে বলেন, “আসলে তেল নাই সেটা বড় কথা না, ভয় হলো কাল যদি দাম ২০ টাকা বেড়ে যায় সেইটা। আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য কয়েক টাকা বাড়লেও অনেক গায়ে লাগে।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির যেকোনো অস্থিরতা বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন তৈরি করে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এই মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে মজুত করা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
পাম্প মালিকরা বলছেন, চাহিদা এভাবে বাড়তে থাকলে স্থানীয় মজুত দিয়ে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। অনেক পাম্পে এরই মধ্যে তেল শেষ হয়ে যাওয়ার নোটিশ ঝোলানোর উপক্রম হয়েছে। সাধারণ ট্রাক ও বাস চালকরা সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন, কারণ তাদের দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, যা তাদের দৈনিক আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পাম্পগুলোতে শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে তেলের লাইন মূল সড়কের যান চলাচলে বিঘ্ন না ঘটায়। তবুও পরিস্থিতির উন্নতি হতে সময় লাগবে বলে মনে করা হচ্ছে।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, বিকেলের দিকে ভিড় আরও বেড়েছে। শহরের ব্যস্ততম এলাকাগুলোতে থমথমে ভাব বিরাজ করছে। সাধারণ মানুষ প্রত্যাশা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত হবে এবং জ্বালানি তেলের বাজার স্থিতিশীল থাকবে। নয়তো মুদ্রাস্ফীতির চাপে পিষ্ট জনগণের ভোগান্তি আরও বহুগুণ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

