মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের কাছে জোরালো এবং সরাসরি অবস্থান প্রত্যাশা করেছে ইরান। বুধবার বিকেলে ঢাকার ইরান দূতাবাসে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে তেহরানের এই মনোভাব স্পষ্ট করেন ইরানের রাষ্ট্রদূত জলিল রহিমী জাহানাবাদী। তিনি আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বন্ধুপ্রতীম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ইরানের ওপর চালানো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য নিন্দা জানাবে।
রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদী তার বক্তব্যে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ একটি প্রভাবশালী মুসলিম রাষ্ট্র। ওআইসি (অর্গানাইজেশন অফ ইসলামিক কোঅপারেশন) এবং জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন বা ন্যাম-এর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে কোনো আগ্রাসী শক্তির অন্যায্য আক্রমণের প্রতিবাদ করা। আমরা আশা করি, একটি মুসলিম দেশ আক্রান্ত হলে বাংলাদেশ তার সংহতি প্রকাশে দ্বিধা করবে না।”
চলমান সামরিক সংঘাত ও ইরানের সক্ষমতা নিয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে রাষ্ট্রদূত জানান, তার দেশ দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ড্রোন এবং মিসাইল প্রযুক্তিতে ইরানের স্বনির্ভরতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমাদের প্রয়োজনীয় সামরিক শক্তি ও লজিস্টিক সাপোর্ট রয়েছে। আমরা অন্য কোনো দেশের কাছে সামরিক সাহায্য চাইছি না; আমরা কেবল চাই একটি মুসলিম দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আমাদের প্রতি সহানুভূতি ও নৈতিক সমর্থন বজায় রাখুক।”
আগ্রাসনের মুখে থাকা ইরানে অবস্থানরত বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ নিরসনেও কথা বলেন রাষ্ট্রদূত। তিনি নিশ্চিত করেন যে, সেখানে থাকা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ইতোমধ্যে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে সঠিক কতজন বাংলাদেশি বর্তমানে ইরানে অবস্থান করছেন, তার তাৎক্ষণিক পরিসংখ্যান দিতে না পারলেও তিনি জানান, তেহরানে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করছে।
রাষ্ট্রদূত জাহানাবাদী আরও যোগ করেন, “আমরা ইরানি নাগরিক বা বিদেশিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করি না। আমাদের দেশে বর্তমানে যারা অবস্থান করছেন, তাদের যেকোনো সমস্যা সমাধানে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সমানভাবে পদক্ষেপ নিচ্ছে। যখনই কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হবে, ইরান সরকার তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।”
সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মেরুকরণের বিষয়টিও। রাষ্ট্রদূত ইঙ্গিত দেন যে, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে নীরব থাকা মানে পরোক্ষভাবে আগ্রাসনকে সমর্থন করা। তাই ওআইসি-র মতো প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের জোরালো কণ্ঠস্বর ইরানের জন্য বড় ধরনের কূটনৈতিক নৈতিক সমর্থন হতে পারে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে পরিবর্তন এবং বৈশ্বিক রণক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান নিয়ে যে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে, তার রেশ ধরেই ঢাকার এই সংবাদ সম্মেলনকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, দীর্ঘদিনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখা বাংলাদেশ ইরানের এই সরাসরি আহ্বানে কেমন সাড়া দেয়।

