দেশের প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এখন থেকে প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রবর্তন করা হচ্ছে ‘ই-হেলথ’ কার্ড। বুধবার সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এই বিশেষ নির্দেশনা প্রদান করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিকের স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজে সংরক্ষিত থাকবে। ফলে দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে রোগীরা দ্রুত ও নির্ভুল চিকিৎসা সুবিধা পাবেন। বৈঠকে উপস্থিত থাকা প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন পরবর্তীকালে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অবিলম্বে ই-হেলথ কার্ড চালুর প্রক্রিয়া শুরু করার নির্দেশ দিয়েছেন। সরকারের মূল লক্ষ্য হলো চিকিৎসাসেবা কেবল শহরকেন্দ্রিক না রেখে প্রান্তিক মানুষের হাতের নাগালে নিয়ে আসা। এ লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় এবং জনবান্ধব হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন সরকারপ্রধান।
বৈঠকের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল সরকারি বিভিন্ন সংস্থার অব্যবহৃত বা পরিত্যক্ত ভবনগুলো কাজে লাগানো। আলোচনায় উঠে আসে যে, সারা দেশে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সহ বিভিন্ন দপ্তরের অসংখ্য ভবন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। শুধুমাত্র এলজিইডি-রই এমন ১৭০টি ভবন চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, এসব পরিত্যক্ত ভবন দ্রুত সংস্কার করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিয়ে আসতে হবে। সেখানে আধুনিক ক্লিনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করে স্থানীয় মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। এতে করে নতুন ভবন নির্মাণের বিশাল খরচ যেমন বাঁচবে, তেমনি দ্রুততম সময়ে সেবার আওতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়েও বৈঠকে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর বাংলাদেশে প্রায় ৩৪ লাখ নবজাতকের জন্ম হচ্ছে। এই বিশাল সংখ্যার চাপ সামলাতে এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে আরও কার্যকর ও তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি মনে করেন, পরিকল্পিত পরিবার গঠনই টেকসই উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সংকেত মিলেছে এই বৈঠকে। বিএনপির ইশতেহার অনুযায়ী স্বাস্থ্যখাতে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই জনবলের ৮০ শতাংশই হবেন নারী এবং বাকি ২০ শতাংশ পুরুষ। এছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শূন্য পদগুলোতে দ্রুত চিকিৎসক ও কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করতে বলা হয়েছে।
দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর করুণ দশা নিয়েও কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে হাওর, চর ও পাহাড়ি অঞ্চলের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতি নিয়ে তিনি কঠোর মনোভাব পোষণ করেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনকে নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসকরা যেন কর্মস্থলে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন এবং সেবা নিশ্চিত করেন, তা কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে।
স্বাস্থ্যখাতের এই আমূল সংস্কারের বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতসহ সরকারের নীতি-নির্ধারক ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ই-হেলথ কার্ড এবং পরিত্যক্ত ভবনে ক্লিনিক স্থাপনের এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকাংশেই কমে আসবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে ‘স্মার্ট স্বাস্থ্যসেবা’র দিকে এগিয়ে যাওয়ার এই যাত্রায় ই-হেলথ কার্ডকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মাঠ পর্যায়ে এই নির্দেশনার বাস্তবায়ন কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়।

