একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের এক দীর্ঘ আইনি পথচলার অবসান ঘটল আজ। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আমৃত্যু কারাদণ্ড পাওয়া বাগেরহাটের খান আকরাম হোসেনকে খালাস দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। দীর্ঘ শুনানি ও আইনি পর্যালোচনার পর আদালত এই সিদ্ধান্ত জানান। গতকালই আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় রায় ঘোষণার জন্য আজকের দিনটি নির্ধারিত ছিল। এই রায়ের মধ্য দিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এক বির্তকিত অধ্যায়ের আইনি সমাপ্তি ঘটল।
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৫ সালের ১১ আগস্ট। সেদিন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ বাগেরহাটের এই বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেছিলেন। সেই রায়ে কুখ্যাত ‘সিরাজ মাস্টার’ ওরফে শেখ সিরাজুল হককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। একই মামলায় খান মো. আকরাম হোসেনকে দেওয়া হয়েছিল আমৃত্যু কারাদণ্ড।
ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন রায়ে বলা হয়েছিল, এই মামলার তিনজন আসামির মধ্যে সিরাজুল হকের বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের পাঁচটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। অন্যদিকে, আকরামের বিরুদ্ধে আনা তিনটি অভিযোগের মধ্যে মাত্র একটি প্রমাণিত হওয়ায় তাকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিচারকগণ তখন আদেশ দিয়েছিলেন যে, সিরাজের মৃত্যুদণ্ড ফায়ারিং স্কোয়াডে অথবা ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে কার্যকর করতে হবে।
তবে ট্রাইব্যুনালের সেই রায়ে সন্তুষ্ট হতে পারেননি খান আকরাম হোসেন। নিজের নির্দোষিতা দাবি করে তিনি উচ্চ আদালতে আপিল করেন। সেই আপিল আবেদনের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে আইনি বিতর্ক ও সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ শেষে আজ সর্বোচ্চ আদালত তাকে খালাস দেওয়ার আদেশ দিলেন।
উল্লেখ্য, এই মামলার শুরু থেকে তিনজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। তবে মামলার বিচারকাজ চলাকালীন অন্যতম আসামি আবদুল লতিফ তালুকদার মারা যাওয়ায় তাকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ফলে লড়াইটি সীমাবদ্ধ ছিল সিরাজ মাস্টার এবং আকরাম হোসেনের মধ্যে।
বাগেরহাট অঞ্চলে একাত্তরের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে সংঘটিত হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় এই মামলাটি ছিল অত্যন্ত সংবেদনশীল। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বিচারের আশায় প্রহর গুনেছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ে তারা সন্তোষ প্রকাশ করলেও, আজ উচ্চ আদালতের এই খালাসের রায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আইনজীবীদের মতে, উচ্চ আদালত সাক্ষ্যপ্রমাণের সীমাবদ্ধতা বা আইনি কোনো ত্রুটির কারণে আকরামকে খালাস দিয়ে থাকতে পারেন। তবে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে এই খালাসের বিস্তারিত কারণ এবং যুক্তিতর্ক সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
বর্তমানে এই মামলাটি নিয়ে আইনি মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্রপক্ষ তাদের প্রসিকিউটরদের দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করছে, অন্যদিকে আসামিপক্ষ এই রায়কে আইনি বিজয় হিসেবে দেখছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম অবশ্য আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, প্রসিকিউটরদের কোনো প্রকার অনিয়ম বা দুর্নীতি বরদাস্ত করা হবে না।
খান আকরাম হোসেনের খালাস পাওয়ার এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এটি প্রমাণ করে যে, উচ্চ আদালতে যথাযথ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদেরও রায় পরিবর্তনের সুযোগ থাকে।
এখন সবার নজর পূর্ণাঙ্গ রায়ের দিকে, যেখানে আদালত ব্যাখ্যা করবেন ঠিক কোন প্রমাণের অভাবে বা আইনি যুক্তিতে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া আমৃত্যু কারাদণ্ডের আদেশটি বাতিল করা হলো। বাগেরহাটের স্থানীয় মানুষের মাঝেও এই রায় নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ।

