সরকারি দপ্তরগুলোতে কাজের গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। এখন থেকে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্ধারিত সময়ে অফিসে আসা এবং প্রস্থান নিশ্চিত করার জন্য কড়া নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) এই সংক্রান্ত একটি বিশেষ চিঠি সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো ওই নির্দেশনায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, প্রতিটি স্তরের কর্মচারীকে দাপ্তরিক সময়সূচী কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে। দেশের সব বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং সিনিয়র সচিবদের কাছে পাঠানো এই চিঠিতে মাঠ পর্যায়ের তদারকি বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিনের ঢিলেঢালাভাবে অফিস করার সংস্কৃতি বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্দেশনাটিতে মূলত দুটি আইনি কাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে—’সরকারি কর্মচারী (নিয়মিত উপস্থিতি) বিধিমালা, ২০১৯’ এবং ‘সচিবালয় নির্দেশমালা, ২০২৪’। এই বিধিমালার ৮৬ নম্বর নির্দেশ অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী চাইলেই নিজের ইচ্ছেমতো অফিসে আসতে বা অফিস থেকে বিদায় নিতে পারবেন না। প্রতিটি দপ্তরের প্রধানকে নিশ্চিত করতে হবে যে, তার অধীনে কর্মরত সবাই ঠিক সময়ে ডেস্কে উপস্থিত থাকছেন।
শুধু অফিস চলাকালীন উপস্থিতিই নয়, ছুটির দিনের চলাচলের ওপরও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে এই চিঠিতে। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সাপ্তাহিক বা সাধারণ ছুটির দিনেও যদি কেউ কর্মস্থল এলাকা ত্যাগ করতে চান, তবে তাকে অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লিখিত বা মৌখিক অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া কর্মস্থল ত্যাগের কোনো সুযোগ নেই।
প্রশাসনিক এই আদেশের নেপথ্যে রয়েছে নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ ওঠে যে, সাধারণ মানুষ সরকারি অফিসে গিয়ে সময়মতো কর্মকর্তাদের দেখা পান না। এই জনভোগান্তি লাঘব করতেই মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অধীনস্থ সব দপ্তর ও সংস্থাকে এই নির্দেশনা প্রতিপালনের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই নির্দেশনার ফলে বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের অফিসগুলোতে স্বচ্ছতা ফিরবে। তবে শুধুমাত্র কাগজের নির্দেশনায় কাজ হবে কি না, তা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে এর প্রকৃত বাস্তবায়ন দেখার জন্য নিয়মিত সারপ্রাইজ ভিজিট বা আকস্মিক পরিদর্শনের প্রয়োজন হতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।
সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো এখন থেকে তাদের অধীনস্থ দপ্তরগুলোতে ডিজিটাল হাজিরা বা ম্যানুয়াল হাজিরা খাতা নিয়মিত পরীক্ষা করার নির্দেশ দিচ্ছে। এই নিয়ম লঙ্ঘিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পথও খোলা রাখা হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে। মূলত প্রশাসনের চেইন অফ কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠাই এই মুহূর্তের প্রধান লক্ষ্য।
এখন দেখার বিষয়, এই নতুন নির্দেশনার ফলে আগামী দিনগুলোতে সরকারি অফিসগুলোর চিরচেনা আমেজ কতটা বদলায়। সময়মতো সেবা পাওয়া জনগণের অধিকার, আর সেই অধিকার নিশ্চিত করতেই সরকার এই কঠোর বার্তা পৌঁছে দিল প্রতিটি টেবিলে।

