ভোরের স্তব্ধতা ভেঙে যে আগুনের লেলিহান শিখা চট্টগ্রামের হালিশহরের একটি পরিবারকে গ্রাস করেছিল, সেই ট্র্যাজেডিতে মৃত্যুর মিছিল আরও দীর্ঘ হলো। ঢাকার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সকালে সামির আহমেদ সুমন (৪০) নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় প্রাণ হারালেন একই পরিবারের তিনজন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটের দিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সুমন। তার শরীরের ৪৫ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক ডা. শাওন বিন রহমান মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, দগ্ধ হওয়ার পাশাপাশি সুমনের শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে ‘ইনহ্যালেশন ইনজুরি’ বলা হয়।
এর আগে একই ঘটনায় মারা যান নুরজাহান আক্তার এবং তার ছেলে শাওন। সোমবার ভোরে সেহরির প্রস্তুতির সময় হালিশহরের ‘হালিমা মঞ্জিল’ নামে একটি ভবনের তৃতীয় তলায় এই বিস্ফোরণ ঘটে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ফ্ল্যাটে আগুন ছড়িয়ে পড়ে, যার কবলে পড়েন একই পরিবারের নয়জন সদস্য। স্বজন হারানোর আহাজারিতে এখন ভারি হয়ে আছে হাসপাতালের বারান্দা।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে চিকিৎসাধীন বাকি ছয়জনের অবস্থাও অত্যন্ত সংকটাপন্ন। তাদের শরীরের বড় একটি অংশ দগ্ধ হওয়ায় এবং শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাউকেই আশঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না। এই দগ্ধদের মধ্যে শিশুও রয়েছে, যারা এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে লড়াই করছে।
প্রাথমিক তদন্তে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের ধারণা, দীর্ঘক্ষণ গ্যাস লাইন থেকে গ্যাস বের হয়ে রান্নাঘরে জমে ছিল। ভোরের দিকে চুলা জ্বালাতে গেলে বা বৈদ্যুতিক সুইচের স্পার্ক থেকে এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ভবনের জানালার কাঁচ ভেঙে চুরমার হয়ে যায় এবং আসবাবপত্র লন্ডভন্ড হয়ে পড়ে।
চট্টগ্রামের এই ঘটনাটি গ্যাস লাইন রক্ষণাবেক্ষণ এবং আবাসিক এলাকায় নিরাপত্তার প্রশ্নটিকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, প্রায়ই বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের গন্ধ পাওয়া গেলেও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের অনীহা এই ধরনের প্রাণহানির মূল কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
উল্লেখ্য, ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে সোমবারই দগ্ধদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম থেকে বিশেষ অ্যাম্বুলেন্স যোগে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টা সত্ত্বেও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। একটি সাজানো গোছানো পরিবারের এমন করুণ পরিণতিতে পুরো এলাকায় শোকের কালো ছায়া নেমে এসেছে।
নিহতদের মরদেহ আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। শোকসন্তপ্ত স্বজনরা এখন বাকিদের প্রাণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, যদিও চিকিৎসকদের কণ্ঠে আশার চেয়ে আশঙ্কার সুরই বেশি শোনা যাচ্ছে।

