গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে অনুষ্ঠিত বহুল আলোচিত গণভোটের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে এবার উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন এক আইনজীবী। ওই ভোটের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ফলাফল বাতিল চেয়ে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন দায়ের করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ তৌহিদ জনস্বার্থে এই আবেদনটি জমা দেন।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, এই রিট আবেদনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং আইন সচিবকে বিবাদী করা হয়েছে। রিটকারী আইনজীবীর দাবি, এই গণভোটের আইনি ভিত্তি এবং ভোট গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে সাংবিধানিক অস্পষ্টতা রয়েছে। আগামী সপ্তাহে বিচারপতি ফাতেমা নজীবের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে এই চাঞ্চল্যকর আবেদনটির ওপর প্রাথমিক শুনানি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফেব্রুয়ারির সেই কনকনে শীতের সকালে অনুষ্ঠিত গণভোটে মূলত দেশের চলমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো পরিবর্তনের পক্ষে-বিপক্ষে রায় দেওয়ার সুযোগ ছিল জনগণের কাছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ আনুষ্ঠানিকভাবে ফল ঘোষণা করে জানিয়েছিলেন, ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। অর্থাৎ, ভোটারদের একটি বড় অংশ পরিবর্তনের পক্ষে তাদের রায় দিয়েছেন।
ইসির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ওই গণভোটে মোট প্রদত্ত ভোটের হার ছিল ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর মধ্যে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ জন ভোটার ‘হ্যাঁ’ বাক্সে তাদের রায় প্রদান করেন। অন্যদিকে, প্রস্তাবিত পরিবর্তনের বিপক্ষে অর্থাৎ ‘না’ ভোট পড়েছিল ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ভোটারদের উপস্থিতিও ছিল চোখে পড়ার মতো।
তবে এই বিশাল সংখ্যক ভোটারের রায়ের পরও কেন আইনি চ্যালেঞ্জ এল, তা নিয়ে আইনি মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। রিটকারীর পক্ষ থেকে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, গণভোটের আয়োজনে কিছু পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল যা সংবিধানের মূল চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। বিশেষ করে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ততা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্নগুলো আগে থেকেই ছিল, রিট আবেদনে সেগুলোকে সামনে আনা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রিট আবেদনের ফলে গণভোটের মাধ্যমে আসা বড় পরিবর্তনের পথে কিছুটা হলেও আইনি বাধা তৈরি হতে পারে। যদি আদালত রিটটি আমলে নেয় এবং কোনো স্থগিতাদেশ প্রদান করে, তবে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে নতুন করে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে হবে। অন্যদিকে, পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেওয়া সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও এই আইনি পদক্ষেপ নিয়ে কৌতূহল ও কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে গণভোট আয়োজনকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত ছিল রাজপথ। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এই ভোট নিয়ে ছিল পাল্টাপাল্টি অবস্থান। একদিকে সরকার পক্ষ যখন এই জয়কে জনগণের ‘ঐতিহাসিক ম্যান্ডেট’ হিসেবে অভিহিত করছে, তখন বিরোধী পক্ষগুলো শুরু থেকেই এই গণভোট বর্জনের ডাক দিয়েছিল। আদালতের এই নতুন মোড় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলল।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে, ভোট গ্রহণ স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ হয়েছে। সিইসি ও অন্যান্য কমিশনাররা বারবার জোর দিয়েছেন যে, জনরায়ের প্রতিফলনই এই ফলাফলে দেখা গেছে। তবে উচ্চ আদালতে রিট দাখিলের পর কমিশনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আইনজীবীদের একটি অংশ মনে করছেন, যেহেতু এটি জনস্বার্থের সাথে জড়িত এবং সরাসরি সংবিধানের সাথে সম্পর্কিত, তাই আদালত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিষয়টি বিবেচনা করবে। আগামী সপ্তাহের শুনানিই বলে দেবে দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কার কোন দিকে মোড় নিচ্ছে। ততক্ষণে রাজপথ আর আদালতের বারান্দায় কান পেতে থাকবে উৎসুক মানুষ।

