বাংলাদেশ এখন আর কেবল ঘাত-প্রতিঘাত ও সংকট থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো সাধারণ গল্প নয়; বরং এটি এখন বিশ্ব মানচিত্রে এক ‘অমিত সম্ভাবনার দেশ’। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে এই শক্তিশালী আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। ১৮ মাসের দায়িত্ব পালন শেষে তিনি যখন বিদায় নিচ্ছেন, তখন তার কণ্ঠে ছিল বাংলাদেশের তারুণ্য ও ভৌগোলিক অবস্থানের অপার সম্ভাবনা নিয়ে এক বিশাল স্বপ্ন।
ড. ইউনূস তার ভাষণে দেশের তরুণ প্রজন্মকে সবচাইতে বড় সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, “আমাদের সাহসী ও সৃজনশীল তরুণদের যদি উপযুক্ত শিক্ষা এবং বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তবে জাপান, কোরিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ-আমেরিকা—সবাই বাংলাদেশের মেধা ও শ্রমের ওপর নির্ভর করবে।” মেধা ও সততার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে পারলে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রধান ‘দক্ষ জনশক্তি সরবরাহকারী’ দেশে পরিণত হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে এই সরকার যে বড় সাফল্য দেখিয়েছে, তার প্রমাণ হিসেবে ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও শুল্ক চুক্তির কথা উল্লেখ করেন। তিনি একে কেবল একটি বাণিজ্যিক সুবিধা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত ভিত্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্ক হার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে আনা হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ব্যবহার করে পোশাক তৈরিতে শূন্য শুল্ক সুবিধা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
জাপানের সঙ্গে সম্পাদিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিকে (ইপিএ) তিনি ঐতিহাসিক হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই চুক্তির সুবাদে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স এবং গ্রিন টেকনোলজির মতো উচ্চমূল্যের শিল্পপণ্যের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। তিনি জানান, জাপানে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা নিতে বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হবে।
আঞ্চলিক রাজনীতির বাইরেও উন্নয়ন সহযোগিতায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক গভীরতর করার কথা উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি জানান, গত বছর বেইজিং সফরের পর তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া নীলফামারীতে এক হাজার শয্যার একটি আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল নির্মাণে দুদেশ একমত হয়েছে, যা উত্তরাঞ্চলের চিকিৎসাসেবায় আমূল পরিবর্তন আনবে।
বন্দর ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে আন্তর্জাতিক নামকরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির কাজ অনেক দূর এগিয়েছে বলেও জানান ড. ইউনূস। তিনি মনে করিয়ে দেন, বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে না পারলে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। নেপাল, ভুটান ও ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ এ অঞ্চলের একটি বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র বা ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে ওঠার শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছে।
বিদায়লগ্নে ড. ইউনূস দেশবাসীকে একটি বার্তা দিয়ে যান—বাংলাদেশ এখন আর কেবল সস্তা শ্রমের দেশ নয়, বরং এটি একটি প্রযুক্তি ও দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে ‘শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং সততা’—এই তিনটি মূল মন্ত্রের ওপর সবচাইতে বেশি জোর দিতে হবে।

