দীর্ঘ ১৮ মাসের এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ও সংস্কারমুখী অধ্যায়ের ইতি টেনে জাতির কাছ থেকে বিদায় নিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া শেষ ভাষণে তিনি নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান। তার কণ্ঠে ছিল গণতন্ত্রের চিরাচরিত মাহাত্ম্য আর একটি সফল নির্বাচনের তৃপ্তি।
বিগত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ড. ইউনূস বলেন, “হার-জিতই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এই নির্বাচনে যারা জয়ী হয়েছেন এবং যারা পরাজিত হয়েছেন, আমি উভয় পক্ষকেই অভিনন্দন জানাই।” তিনি এক গাণিতিক ব্যাখ্যায় বলেন, জয়ীরা মোট ভোটের প্রায় অর্ধেক পেলেও পরাজিতরাও অর্ধেকের কাছাকাছি ভোটারের আস্থা পেয়েছেন। ফলে কেউ নিজেকে একা ভাবার অবকাশ নেই।
ভাষণের শুরুতেই তিনি গত ১৭ বছরের স্থবিরতা ভেঙে একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন উপহার দেওয়ার জন্য দেশের রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি ‘উৎকৃষ্ট উদাহরণ’ হয়ে থাকবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই জনগণের ভোটাধিকার পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
পেছনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ড. ইউনূস ৫ই আগস্টের সেই ‘মহামুক্তির’ দিনটির কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, “তরুণ ছাত্রছাত্রীরা দেশটিকে এক দৈত্যের গ্রাস থেকে বের করে এনেছিল। অচল একটি দেশকে সচল করার গুরুভার যখন ছাত্রনেতারা আমার কাঁধে তুলে দিল, আমি তখন বিদেশে। প্রথমে রাজি না হলেও জাতির প্রতি কর্তব্যের টানে আমি দায়িত্ব নিয়েছিলাম।”
তিনি তার সরকারের শুরুর দিনগুলোর সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, সবচেয়ে কঠিন কাজ ছিল ভেঙে পড়া রাষ্ট্রযন্ত্রকে সচল করা। যারা দেশকে লুটেপুটে খেত, তারাই তখন প্রশাসনের মূল চালিকাশক্তি ছিল। অভ্যুত্থানের পর সেই সব প্রভাবশালী ও অনুগত আমলারা যখন পালিয়ে গেল বা ভোল পাল্টালো, তখন কাকে বিশ্বাস করা যাবে তা নিয়ে এক মহাসংকট তৈরি হয়েছিল। সেই ক্রান্তিকাল পাড়ি দিয়ে আজ একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে দায়িত্ব তুলে দেওয়াকে তিনি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন।
প্রধান উপদেষ্টা তার ভাষণে সংস্কার, বিচার এবং নির্বাচন—এই তিনটি মূল স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, “কোথায় কতটুকু সফল হয়েছি বা কোথায় ব্যর্থ হয়েছি, সেই বিচারের ভার আমি দেশবাসীর ওপর ছেড়ে দিলাম। তবে আমাদের প্রচেষ্টায় কোনো ঘাটতি ছিল না।” তিনি দাবি করেন, গত ১৮ মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুর্নীতির বিচার প্রক্রিয়াকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে।
একই সাথে তিনি ‘জুলাই সনদ’-এর ওপর অনুষ্ঠিত গণভোটের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বাস করেন, এই সাংবিধানিক পরিবর্তনগুলো ভবিষ্যতে কোনো সরকারকে জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে বাধা দেবে। ড. ইউনূসের মতে, এবারের নির্বাচন কেবল একটি ক্ষমতা বদল নয়, বরং এটি একটি ‘নতুন বাংলাদেশের জন্ম’।
ভাষণের শেষে ড. ইউনূস অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে দেশবাসীর কাছ থেকে বিদায় নেন। দীর্ঘ দেড় যুগের অস্থিরতা শেষে বাংলাদেশ যে একটি স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক পথে যাত্রা শুরু করেছে, সেই তৃপ্তি নিয়েই তিনি তার কর্মস্থল থেকে বিদায় নিচ্ছেন। আগামীকাল মঙ্গলবার নতুন মন্ত্রিসভার শপথের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ।

