দীর্ঘ টানাপোড়েন আর দরকষাকষির পর অবশেষে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’-এ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দলটির পক্ষ থেকে এই ঐতিহাসিক দলিলে সই করা হয়। এর মাধ্যমে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করা এই ঐকমত্যের দলিলটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্বাক্ষর শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এনসিপি-এর আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলাম জানান, কোনো শর্ত ছাড়া নয়, বরং জনগণের আকাঙ্ক্ষা এবং গণভোটের রায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই তারা এই পদক্ষেপে গিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমরা সই করেছি এই শর্তে যে, গণভোটে প্রাপ্ত জনরায়ের প্রতিটি সংস্কারের দাবি অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করতে হবে।”
এর আগে এনসিপি এই সনদে সই করা থেকে বিরত ছিল। সেই প্রসঙ্গের ব্যাখ্যা দিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, “জুলাই সনদে একটি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের সুযোগ রাখা হয়েছিল। আমরা মনে করি, জাতীয় ঐক্যের কোনো দলিলে ভিন্নমত থাকার মানে হলো সিদ্ধান্তটি অসম্পূর্ণ রাখা। তাই আমাদের আপত্তির পর ‘জুলাই জাতীয় সনদ আদেশ’ জারি করা হয়, যার ওপর ভিত্তি করে সাম্প্রতিক নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।”
নাহিদ ইসলামের মতে, গণভোটে দেশের মানুষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে তারা রাষ্ট্রের আমূল সংস্কার ও ন্যায়ের পক্ষে। এনসিপি মনে করে, এখন আর কোনো নোট অব ডিসেন্টের প্রয়োজন নেই। তাই তারা ভিন্নমতের জায়গাটি বাদ রেখেই এই দলিলে সই করেছেন। এর মাধ্যমে তারা মূলত নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যে স্বপ্ন জুলাইয়ের অভ্যুত্থান দেখিয়েছিল, তাকেই পোক্ত করতে চাইছেন।
আগামীকাল মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। ঠিক তার আগের সন্ধ্যায় এনসিপির এই যোগদান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নাহিদ ইসলাম বলেন, “আগামীকাল থেকে আমাদের মূল কাজ হবে সংস্কার সভা এবং সংস্কার পরিষদে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় অনুযায়ী রাষ্ট্র মেরামত করা। জনগণ আমাদের সংসদে পাঠিয়েছে এই সংস্কারের ম্যান্ডেট দিয়ে।”
অতীতের স্মৃতি চারণ করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শুরু থেকেই তারা রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং পরবর্তী সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি—প্রতিটি ধাপে তারা সংস্কারের প্রশ্নে আপসহীন ছিলেন। কিন্তু আইনি ভিত্তি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো দলিলে সই করতে রাজি ছিলেন না। আজ অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিনে সেই আইনি কাঠামোর নিশ্চয়তা পেয়েই তারা সরকারের আমন্ত্রণে যমুনায় আসেন।
এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নাহিদ ইসলামের সঙ্গে ছিলেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন, যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার, জাভেদ রাসিন, মনিরা শারমিন এবং যুগ্ম সদস্য সচিব জহিরুল ইসলাম মুসা।
বিশ্লেষকদের মতে, এনসিপির এই স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সংস্কার প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের গতি আসবে। সংসদে এই তরুণ ও সংস্কারপন্থী দলটির উপস্থিতি পুরাতন রাজনৈতিক সংস্কৃতির মোড় পরিবর্তন করতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

