বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোর সর্বোচ্চ ও সবচাইতে স্পর্শকাতর পদ মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ড. নাসিমুল গনি। সোমবার এক ব্যস্ততম দুপুরে সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে যোগ দেওয়ার পর তিনি গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। তার কথায় উঠে এসেছে একদিকে ব্যক্তিগত বিনয়, অন্যদিকে আগামীর বিশাল কর্মযজ্ঞের এক কঠিন চ্যালেঞ্জ।
দেশের এক অস্থির এবং রূপান্তরকামী সময়ে এই নিয়োগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির পর ঠিক দুপুর সোয়া ১টায় তিনি সচিবালয়ের ১ নম্বর ভবনে প্রবেশ করেন। সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকরা যখন তার প্রতিক্রিয়া জানতে চান, ড. গনি সরাসরি নিজের অভিজ্ঞতার ওপর ভরসা রাখার কথা জানান।
তিনি বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, দেশের এক অনন্য যুগসন্ধিক্ষণে আমার মতো দুর্বল মানুষের কাঁধে এক বিশাল দায়িত্ব এসে পড়েছে। এই গুরুভার বহনের জন্য তিনি সাধ্যমতো চেষ্টার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় ছিল তার একটি বাক্য— ‘অতীতে যেভাবে কাজ করেছি, সেভাবেই কাজ করব।’ এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি সম্ভবত তার দীর্ঘ প্রশাসনিক জীবনের অর্জিত শৃঙ্খলা ও পেশাদারিত্বের ধারাবাহিকতাকেই ইঙ্গিত করেছেন।
সচিবালয়ের করিডোরে তখন উপচে পড়া ভিড়। নতুন এই কর্মকর্তার আগমনে প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে কিছুটা চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠন এবং শপথ গ্রহণের বিষয়টি এখন টক অফ দ্য টাউন। নাসিমুল গনি নিজেও জানেন, তার সামনে বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। যোগদানের কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়েছে আগামীকালের বড় আয়োজনের প্রস্তুতিতে।
নতুন মন্ত্রিসভার শপথ নিয়ে ড. গনি জানান, মঙ্গলবার দিনটি হবে অত্যন্ত ব্যস্ত। সকালে দুই দফায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজিত হবে। প্রথম ধাপে তারা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন। দ্বিতীয় ধাপে বর্তমান সময়ের সবচাইতে আলোচিত ইস্যু অর্থাৎ ‘রাষ্ট্রীয় সংস্কার’ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তারা বিশেষ শপথ গ্রহণ করবেন।
বিকালে অনুষ্ঠিত হবে মন্ত্রিসভার মূল শপথ অনুষ্ঠান। এই বিশাল আয়োজন সফল করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এখন ‘উঠেপড়ে লেগেছে’ বলে তিনি মন্তব্য করেন। প্রশাসনিক ভাষায় একে ‘লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ’ বলা হলেও নাসিমুল গনির কণ্ঠে ছিল মাঠপর্যায়ের কাজের সেই চিরচেনা দৃঢ়তা। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, বিস্তারিত তথ্য আসার সাথে সাথেই তা সংবাদমাধ্যমকে জানানো হবে।
সব কৌতূহল এখন একটি জায়গাতেই আটকে আছে— মন্ত্রিসভা কত বড় হচ্ছে? কতজন নতুন মুখ আসছেন আর কতজন পুরনো? এই প্রশ্নে অবশ্য ঝানু আমলার মতোই উত্তর দিয়েছেন ড. গনি। তিনি সরাসরি কোনো সংখ্যা উল্লেখ না করে বলেন, ‘এ সম্পর্কে আমার এই মুহূর্তে কোনো মন্তব্য নেই।’ তিনি মনে করেন, এটি নীতিনির্ধারকদের এখতিয়ার এবং তারাই ভালো বুঝবেন দলের বা দেশের প্রয়োজনে কতজন সদস্য প্রয়োজন।
তবে প্রশাসনিক প্রস্তুতির বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের একটি স্ট্যান্ডার্ড বা আদর্শ প্রস্তুতি থাকে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে সেই সংখ্যা কম বা বেশি হতে পারে। এখানে অস্বাভাবিক বা নতুন কিছু নেই। অর্থাৎ, সরকার গঠন ও পরিচালনার যে চিরাচরিত নিয়ম, সেটি মেনেই সব এগোচ্ছে। ড. নাসিমুল গনির এই নির্লিপ্ততা মূলত তার পেশাদারিত্বেরই পরিচয় দেয়, যেখানে কাজের আগে জল্পনা-কল্পনার কোনো স্থান নেই।
সচিবালয়ের এক নম্বর ভবনের পরিবেশ এখন উৎসবের চেয়েও বেশি দায়িত্ববোধের। ড. নাসিমুল গনি যখন কথা বলছিলেন, তার চেহারায় অভিজ্ঞতার ছাপ ছিল স্পষ্ট। তিনি জানেন, একটি দেশের ক্রান্তিকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের ভূমিকা কেবল ফাইলের স্বাক্ষর করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং সরকারের লক্ষ্য বাস্তবায়নে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে হয়।
প্রশাসনিক সংস্কার এবং নতুন সরকারের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করাটাই এখন তার জন্য প্রধান পরীক্ষা। বিশেষ করে দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষা অনেক উঁচুতে। ড. গনির সেই ‘দুর্বল কাঁধ’ আসলে কতটুকু শক্তিশালি তার প্রমাণ পাওয়া যাবে আগামী কয়েক সপ্তাহের কর্মতৎপরতায়। তার দীর্ঘদিনের সহকর্মীরা অবশ্য তাকে একজন দক্ষ এবং নিয়মনিষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবেই চেনেন।
আগামীকাল বিকেলের মন্ত্রিসভার শপথের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে। আর সেই অধ্যায়ের প্রধান চিত্রনাট্যকার বা নেপথ্য কারিগর হিসেবে থাকবেন এই নতুন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। ব্যক্তিগত আবেগ সরিয়ে রেখে তিনি যে নিষ্ঠার কথা বারবার বলছেন, তা প্রশাসনের সর্বস্তরে কতটা সঞ্চারিত হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিকেলে বিদায়ী সচিবের কাছ থেকে দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার পর তিনি সরাসরি বৈঠকে বসেন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে। শপথ অনুষ্ঠানের প্রটোকল থেকে শুরু করে সার্বিক নিরাপত্তা— সব বিষয়েই খুটিনাটি নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। নাসিমুল গনির হাত ধরেই আগামীকালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলো বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। সাংবাদিক এবং সাধারণ মানুষের নজর এখন সেই ১ নম্বর ভবনের দিকেই।

