দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দুয়ারে কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ঐতিহাসিক গণভোট। আগামিকাল ১২ ফেব্রুয়ারি, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই যুগান্তকারী নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশবাসীকে এক বিশেষ বার্তা দিয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি দেশের সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষকে নির্ভয়ে এবং সচেতনভাবে নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচনের প্রাক্কালে দেওয়া এক বাণীতে প্রধান উপদেষ্টা এই দিনটিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অনন্য ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, এটি কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া বা রুটিন নির্বাচন নয়; বরং এটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক ধারা নির্ধারণের এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ।
ড. ইউনূসের বাণীতে উঠে এসেছে গত বছরের জুলাই-আগস্টের সেই উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত একটি জাতি জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে যে আত্মমর্যাদা ও গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছিল, আগামিকালের নির্বাচন সেই আকাঙ্ক্ষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একমাত্র পথ। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই জুলাইয়ের শহীদদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন শুরু হবে বলে তিনি মনে করেন।
প্রধান উপদেষ্টা তার বার্তায় তরুণ প্রজন্মের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ নাগরিক এবারই প্রথমবারের মতো তাদের সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। তাদের এই প্রথম ভোট যেন একটি আনন্দময় ও শঙ্কামুক্ত অভিজ্ঞতা হয়, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকও বিগত বছরগুলোতে প্রকৃত অর্থে ভোট দিতে পারেননি; তাদের জন্যও এই দিনটি হারানো অধিকার ফিরে পাওয়ার উৎসব।
ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো কেমন হবে, তা নির্ধারণে গণভোটের গুরুত্ব অপরিসীম। ড. ইউনূস আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জনগণ তাদের সুচিন্তিত রায়ের মাধ্যমে যোগ্য, দায়বদ্ধ এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশীদার হওয়ার সুযোগ পাবেন, যা একটি কার্যকর গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র।
নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে থাকা শঙ্কা দূর করতেও কঠোর বার্তা দিয়েছেন সরকারপ্রধান। তিনি প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন, সশস্ত্র বাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সকল বাহিনীকে সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ভোটাররা যেন কোনো প্রকার ভয়ভীতি, চাপ বা প্রভাব ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের প্রতিও সংযত আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের এই ঐতিহাসিক অভিযাত্রায় সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। জয়-পরাজয়কে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে একটি স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার পথে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
পরিশেষে, প্রধান উপদেষ্টা আশা প্রকাশ করেন যে, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এই নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং একটি নতুন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ।

