বাংলাদেশের আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে চারদিকে এখন সাজ সাজ রব। এই রাজনৈতিক মহাযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করতে এবার মাঠপর্যায়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকছে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। রাজধানী ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে আয়োজিত এক বিশাল নির্বাচনী প্রস্তুতি সমাবেশে বাহিনীর সদস্যদের প্রতি অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দিয়েছেন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
সমাবেশের শুরুতেই তিনি বাহিনীর সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা করতে এবং তাদের পেশাদারিত্বের গুরুত্ব তুলে ধরতে বেশ কিছু দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। মহাপরিচালক সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে আনসার সদস্যদের ভূমিকা হবে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি শক্তিশালী এবং নিরপেক্ষ। মাঠপর্যায়ে কোনো প্রকার অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করার জন্য তিনি জওয়ানদের প্রতি আহ্বান জানান।
“ভোটকেন্দ্রে আপনাদের দায়িত্ব পালনে কোনো দ্বিধা রাখা চলবে না,” সমাবেশে উপস্থিত হাজারো সদস্যের উদ্দেশে এভাবেই নিজের বক্তব্য শুরু করেন মেজর জেনারেল সাজ্জাদ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, নির্বাচনকে ঘিরে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা অশুভ শক্তির হুমকি কিংবা চাপে ভয় পাওয়া যাবে না। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, সাহসিকতার সাথে নিজের অবস্থানে অটল থাকতে হবে।
আসন্ন এই নির্বাচনে নিরাপত্তার চাদরে দেশকে ঢেকে দিতে এবার রেকর্ডসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। আনসার সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে মোট ৫ লাখ ৫৬ হাজার ১২৭ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য সরাসরি নির্বাচনী ডিউটিতে নিয়োজিত থাকবেন। এটি বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বাহিনীর পক্ষ থেকে অন্যতম বৃহত্তম মোতায়েন।
বিশেষ করে রাজধানী ঢাকাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। মহাপরিচালক জানান, ঢাকা মহানগরের চারটি জোনের অধীনে থাকা ৩৬টি থানার ২ হাজার ১৩১টি ভোটকেন্দ্রে ২৭ হাজার ৭০৩ জন সদস্য নিয়োজিত থাকবেন। প্রতিটি কেন্দ্রে ১৩ জন করে প্রশিক্ষিত আনসার ও ভিডিপি সদস্য সার্বক্ষণিক প্রহরার দায়িত্ব পালন করবেন।
মেজর জেনারেল সাজ্জাদ মাহমুদ তার বক্তব্যে অতীতের কিছু নেতিবাচক ধারণাকে ভেঙে ফেলার ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, “আগে আনসার বাহিনীর কাজ শুধু ব্যালট বাক্স বহন করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল বলে ধারণা করা হতো। কিন্তু সেই দিন এখন শেষ। আজকের আনসার বাহিনী আধুনিক, সুশৃঙ্খল এবং যেকোনো সংকট মোকাবিলায় সক্ষম।”
ভোটের পবিত্রতা বজায় রাখার ব্যাপারে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কিন্তু কড়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন। সদস্যদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “এই নির্বাচন আগের মতো নয় যে আপনারা দাঁড়িয়ে থাকবেন আর অন্য কেউ প্রভাব বিস্তার করবে। ভোটারদের রায় ১৮ কোটি মানুষের আমানত। কেউ যদি আপনাদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করে কিংবা অনৈতিক প্রলোভন দেখায়, তবে তা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।”
আমানতের খেয়ানত না করার জন্য ধর্মীয় ও নৈতিক দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেন বাহিনীর প্রধান। তিনি বিশ্বাস করেন, নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে এই বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের সততা এবং নিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, এবারই প্রথম বাহিনীর সদস্যরা এমন এক বিশাল কর্মযজ্ঞে ঐক্যবদ্ধভাবে শরিক হয়েছেন।
প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এবারের নির্বাচনে আনসার বাহিনী এক ধাপ এগিয়ে। নির্বাচন কমিশন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাথে তাৎক্ষণিক যোগাযোগ বজায় রাখতে এবার ডিজিটাল রিপোর্টিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। যেকোনো বিশৃঙ্খলা বা জরুরি পরিস্থিতি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সদস্যদের হাতে থাকবে বিশেষায়িত ‘সুরক্ষা অ্যাপ’।
এই অ্যাপের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অফলাইন কার্যকারিতা। মহাপরিচালক নিশ্চিত করেছেন যে, কোনো ভোটকেন্দ্রে যদি ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় বা নেটওয়ার্কের সমস্যা থাকে, তবুও ‘সুরক্ষা অ্যাপ’ কাজ করবে। এর মাধ্যমে যেকোনো সংঘাত বা গোলযোগের খবর মুহূর্তের মধ্যে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো সম্ভব হবে।
নির্বাচনী পরিবেশ যেন উৎসবমুখর থাকে, তা নিশ্চিত করাই বাহিনীর মূল লক্ষ্য। সন্ত্রাসীদের উসকানি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টাকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ইতোমধ্যেই সম্পন্ন করা হয়েছে। মহাপরিচালক তার বক্তব্যে বারবার পেশাদারিত্বের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কেড়েছে।
সমাবেশে উপস্থিত মাঠপর্যায়ের সদস্যদের চোখেমুখেও এক ধরনের দৃঢ়তা লক্ষ্য করা গেছে। তারা মনে করছেন, এই বিপুল সংখ্যক মোতায়েন শুধু নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ফেরানোর জন্য। বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হলেও কোনো অবস্থাতেই ভোটকেন্দ্র ত্যাগ না করার যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা জওয়ানদের মনোবল আরও বৃদ্ধি করেছে।
পরিশেষে, মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, দেশের প্রতিটি মানুষ যেন শান্তিপূর্ণ ও ভয়হীন পরিবেশে ভোট দিতে পারে, সেটিই হবে আনসার বাহিনীর আসল সাফল্য। গণতন্ত্রের এই উৎসবে কোনো কালিমা যেন লিপ্ত না হয়, সেই দায়িত্ব পালনে তার বাহিনী বদ্ধপরিকর।
দেশের শান্তি রক্ষা এবং গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রাখতে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর এই সক্রিয় অবস্থানকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, আগামী নির্বাচনে মাঠপর্যায়ে এই নির্দেশনার প্রতিফলন কতটা শক্তিশালীভাবে ঘটে।

