চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্র সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের পথে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মনে করছে, আইনি অস্পষ্টতা এবং রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকারের ফলে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এখন প্রশ্নবিদ্ধ।
রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বর্তমান প্রাক-নির্বাচনী পরিস্থিতি নিয়ে এমন চাঞ্চল্যকর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গণভোটের মতো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইসি ও সরকারের অপরিণামদর্শী অবস্থান জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, নির্বাচন কমিশন তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগে চরম দুর্বলতা দেখাচ্ছে। বিশেষ করে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে কমিশন তার দৃঢ়তা হারিয়েছে। অনলাইনে ও অফলাইনে নির্বাচনী আচরণবিধির ব্যাপক লঙ্ঘন হলেও ইসি কার্যত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারছে না। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশের নিষ্ক্রিয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সংবাদ সম্মেলনে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। টিআইবি প্রধান বলেন, গুগল ও মেটার মতো বৈশ্বিক প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ বা ‘মানি ডিপেন্ডেন্সি’র কারণে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সরাতে অনীহা দেখাচ্ছে। ইসির সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় না থাকায় গুজব ও অপপ্রচার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সবচেয়ে বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্ত। ড. ইফতেখারুজ্জামান একে ‘আইনি বিচ্যুতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী গণভোট কোনোভাবেই নির্বাচনের সমার্থক নয়। কিন্তু ইসি এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়ে একটি অস্পষ্ট আইনি কাঠামোর ওপর ভর করছে।
সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। তফসিল ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীরা ইসির অধীনে থাকার কথা থাকলেও সরকার তাদের গণভোটের প্রচারণায় নামিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সরকার প্রভাবশালী দলগুলোকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে দোদুল্যমান অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে গণভোটের মূল উদ্দেশ্যই ধোঁয়াশায় ঢাকা পড়েছে।”
রাষ্ট্র সংস্কারের পথনকশা হিসেবে টিআইবি ‘জুলাই সনদ’কে সামনে আনার আহ্বান জানিয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বেশ কিছু নির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন। যার মধ্যে রয়েছে: সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ক্ষমতার অপব্যবহারকে কঠোর অপরাধ হিসেবে গণ্য করা। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) সাংবিধানিক মর্যাদা প্রদান।
সংসদে নারী আসন ১০০-তে উন্নীত করা এবং সরাসরি ভোটে ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে দলের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ তৈরি করা। ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির প্রধান পদে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া।
টিআইবি প্রধানের মতে, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল একটি জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। কিন্তু বর্তমানের এই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সেই অর্জনকে ম্লান করে দিতে পারে। তিনি দেশবাসীকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর এবং জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান।
এখন প্রশ্ন হলো, নির্বাচন কমিশন ও সরকার কি টিআইবির এই সতর্কবার্তা আমলে নেবে, নাকি জুলাই অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট আইনি গ্যাঁড়াকলেই আটকা পড়ে থাকবে?

