আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট উৎসবে কেবল সংসদ সদস্য নির্বাচন নয়, বরং দেশের শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক গণভোটও অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে এই গণভোটের আইনি কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশের নানা ফাঁকফোকর নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, কাঠামোগত এই দুর্বলতাগুলোর কারণে গণভোটের ফলাফল শেষ পর্যন্ত প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
শনিবার রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম এই আশঙ্কা প্রকাশ করেন। ‘নির্বাচনী এলাকায় সবুজ সমাজের পরিস্থিতি ও প্রত্যাশা’ শীর্ষক জরিপের ফলাফল প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, জাতীয় নির্বাচন যে মাত্রায় অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়া প্রয়োজন ছিল, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা পুরোপুরি দৃশ্যমান নয়। বিশেষ করে গণভোটের বিষয়টি সাধারণ মানুষের কাছে এখনো অস্পষ্ট।
ড. মোয়াজ্জেম স্পষ্ট করে বলেন, “গণভোটের জন্য যে আইনি কাঠামো এবং অধ্যাদেশ অনুসরণ করা হচ্ছে, তার মধ্যে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। জনগণের একটি বড় অংশ জানেই না যে তারা আসলে কিসের ওপর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্রক্রিয়ার বদলে একপাক্ষিক প্রচারণার চিত্র ফুটে উঠছে, যা গণভোটের মূল চেতনার পরিপন্থী।” তিনি আরও যোগ করেন, নির্বাচনী প্রচারণার পুরো আলো এখন সংসদ নির্বাচনের দিকে থাকায় গণভোটের গুরুত্ব ভোটারদের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছায়নি।
এবারের নির্বাচনে পরিবেশগত বিষয় বা ‘সবুজ সমাজ’ গঠনের ওপর সিপিডির পরিচালিত গবেষণায় উঠে এসেছে কিছু চমকপ্রদ তথ্য। দেশের ১৫০টি নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থী ও ভোটারদের ওপর চালানো এই জরিপে দেখা গেছে, ৭৭ শতাংশ ভোটার মনে করেন রাস্তাঘাট আর কালভার্ট নির্মাণই হলো আসল উন্নয়ন। পরিবেশ রক্ষা বা নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো দীর্ঘমেয়াদী সংকটের চেয়ে ব্যক্তিগত ও তাৎক্ষণিক সমাধানকেই ভোটাররা প্রাধান্য দিচ্ছেন। জরিপে অংশ নেওয়া ৪৫০ জন প্রার্থীর মধ্যে মাত্র ৪২ শতাংশ এবং ভোটারদের মধ্যে ৪৭ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা রাখেন।
সিপিডির গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারেও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি অনেকটা গৌণ। ড. মোয়াজ্জেম বলেন, “থিংক ট্যাংক হিসেবে আমরা দলগুলোর ইশতেহার গভীরভাবে বিশ্লেষণ করছি। আমরা দেখছি দলগুলোর প্রতিশ্রুতির মধ্যে পার্থক্য কোথায় এবং কোন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যাগুলো তারা এড়িয়ে যাচ্ছে।” তিনি মনে করেন, এবারের নির্বাচনে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকেই বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন, কারণ গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে যে আইনি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তা পরবর্তীতে জাতীয় পর্যায়ে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
মিডিয়া ব্রিফিংয়ে আরও উপস্থিত ছিলেন সিপিডির প্রধান নির্বাহী ড. ফাহমিদা খাতুনসহ অন্যান্য উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বলেন, জনগণের প্রত্যাশা আর প্রার্থীর প্রতিশ্রুতির মধ্যে যে বড় ফারাক রয়েছে, তা এবারের জরিপে স্পষ্ট। বিশেষ করে দুর্যোগপ্রবণ এলাকার ভোটাররা টেকসই উন্নয়নের দাবি করলেও প্রার্থীরা এখনো পুরনো ঘরানার অবকাঠামোগত উন্নয়নের গল্পই শুনিয়ে যাচ্ছেন।
১২ ফেব্রুয়ারির ভোটগ্রহণকে কেন্দ্র করে সারা দেশে যখন সাজ সাজ রব, তখন সিপিডির এই সতর্কবার্তা সুশীল সমাজের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গণভোটের ফলাফল যদি বিতর্কিত হয়, তবে তা গণতান্ত্রিক সংস্কারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

