রাজনীতির মাঠে ভোটের লড়াই শুরুর আগেই প্রার্থীদের ধনসম্পদ আর ঋণের হিসাব নিয়ে শুরু হয়েছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রার্থীদের বড় একটি অংশই কেবল যে বিত্তবান তা নয়, বরং বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝাও রয়েছে অনেকের মাথায়। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সংগৃহীত তথ্য বলছে, এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া মোট ২ হাজার ২৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ৫১৯ জনই কোনো না কোনোভাবে ঋণগ্রহীতা। অর্থাৎ প্রতি চারজন প্রার্থীর মধ্যে একজনেরও বেশি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণী।
শনিবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরে সুজন। প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণ করে সংগঠনটি জানায়, ঋণগ্রহীতা প্রার্থীদের এই তালিকায় সবার ওপরে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির ১৬৭ জন প্রার্থী ঋণ নিয়েছেন, যা মোট ঋণগ্রহীতা প্রার্থীর প্রায় ৩২ শতাংশ। এছাড়া ৭৫ জন প্রার্থীর ঋণের পরিমাণ পাঁচ কোটি টাকারও বেশি।
সংবাদ সম্মেলনে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার বলেন, প্রার্থীদের আয়ের তথ্যে এক বড় ধরনের বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। একদিকে যেমন ৮৩২ জন প্রার্থীর বার্ষিক আয় ৫ লাখ টাকার নিচে, অন্যদিকে ৯৫ জন প্রার্থীর আয় বছরে এক কোটি টাকার ওপরে। কোটিপতি প্রার্থীদের এই তালিকায় বিএনপি এগিয়ে থাকলেও স্বতন্ত্র এবং অন্যান্য দলের প্রার্থীরাও পিছিয়ে নেই। আয়ের দিক থেকে এবার সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন কুমিল্লা-৮ আসনের বিএনপি প্রার্থী জাকারিয়া তাহের, যার বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে প্রায় ৬০ কোটি টাকা।
আয়কর প্রদানের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে মিশ্র চিত্র। মোট প্রার্থীর মধ্যে ১ হাজার ৩১৯ জন আয়করের তথ্য দিলেও ১৩২ জন প্রার্থী কেবল টিআইএন সনদ জমা দিয়েই দায় সেরেছেন। সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক প্রার্থী আয়কর বিবরণী দাখিল না করেই মনোনয়ন জমা দিয়েছেন, যা আইনগতভাবে অসম্পূর্ণ। তবুও তাদের মনোনয়ন বৈধতা পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আয়ের শীর্ষ তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন টাঙ্গাইল-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আসাদুল ইসলাম (৪০ কোটি টাকা) এবং তৃতীয় অবস্থানে লক্ষ্মীপুর-১ আসনের ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী জাকির হোসেন পাটওয়ারী (১৯ কোটি টাকা)। শীর্ষ দশের বাকিদের মধ্যে মির্জা আব্বাস, সালাহউদ্দিন আহমদ এবং কায়সার কামালের মতো হেভিওয়েট বিএনপি নেতাদের নাম উঠে এসেছে।
সুজনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তুলনায় এবার ঋণগ্রহীতা প্রার্থীর হার সামান্য কমলেও প্রার্থীদের গড় আয়ের পরিমাণ বেড়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের এবং কৃষিপ্রধান এলাকার প্রার্থীদের চেয়ে ব্যবসায়ী প্রার্থীদের সম্পদের পাহাড় অনেক বেশি উচ্চ। ১৫৫ জন প্রার্থী তাদের হলফনামায় আয়ের ঘরটি রহস্যজনকভাবে খালি রেখেছেন, যা ভোটারদের তথ্য পাওয়ার অধিকারে বড় বাধা বলে মনে করছে সুজন।
সংবাদ সম্মেলনে সুজন নেতারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যারা কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা শোধ করেননি, তাদের সংসদে যাওয়া নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়। ভোটারদের উচিত প্রার্থীদের এই ‘আমলনামা’ দেখে বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের এই আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও মন্তব্য করেন তারা।

