অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারি প্রশাসনে আমূল পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, নতুন বাংলাদেশে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির বিন্দুমাত্র স্থান থাকবে না। কেবল দুর্নীতি দমনই নয়, বরং ফাইল আটকে রাখার দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক সংস্কৃতি বন্ধ করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়নসংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট (জিআইইউ) এই প্রতিবেদনটি তার কাছে হস্তান্তর করে।
নাগরিকের কাছে যাবে সরকার, সরকারে কাছে নয়
প্রশাসনের আধুনিকায়ন নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, “আমাদের লক্ষ্য একটাই—নাগরিককে সেবার জন্য সরকারের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরতে হবে না; বরং সরকারের সেবা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পৌঁছে যাবে নাগরিকের কাছে।” তিনি মনে করেন, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে সাধারণ মানুষ কোনো হয়রানি ছাড়াই তাদের পাওনা পরিষেবা ভোগ করতে পারেন।
তিনি কর্মকর্তাদের সতর্ক করে বলেন, সরকারি ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ফাইল আটকে থাকা এখন থেকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রতিটি কাজ হতে হবে গতিশীল এবং স্বচ্ছ।
প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সংস্কার ও র্যাংকিং
প্রধান উপদেষ্টা দেশের সরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় বড় বড় ভবন আছে কিন্তু দক্ষ প্রশিক্ষক নেই। আবার প্রশিক্ষণ পদ্ধতিগুলোও মান্ধাতা আমলের। তিনি গৎবাঁধা লেকচার ভিত্তিক প্রশিক্ষণের বদলে ‘প্রবলেম সলভিং’ বা সমস্যা সমাধানমূলক শিক্ষা প্রদানের নির্দেশ দেন।
প্রশিক্ষণার্থীদের উৎসাহিত করতে তিনি একটি অভিনব প্রস্তাব দেন। কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে নম্বর ও ইনসেনটিভ বা উদ্দীপনা প্রদানের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ‘র্যাংকিং’ বা মানক্রম করার কথা বলেন তিনি। তার মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানের মান এমন পর্যায়ে নিতে হবে যাতে বেসরকারি খাতের কর্মীরাও সেখানে প্রশিক্ষণ নিতে পেরে গর্ব অনুভব করেন।
ঐতিহাসিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন
জনপ্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত ১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রশিক্ষণ কাউন্সিলের বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা একটি দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। সেই আলোকেই জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর কারিগরি সহায়তায় প্রথমবারের মতো দেশের পাঁচটি শীর্ষস্থানীয় প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের ওপর এই মূল্যায়ন কার্যক্রম চালানো হয়।
প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), বিসিএস প্রশাসন একাডেমি, বিয়াম ফাউন্ডেশন, জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমি (নাডা) এবং জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমি (এনএপিডি)। কমিটির সদস্যরা জানান, বাংলাদেশে এই ধরনের বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন এটিই প্রথম। এতে একাডেমিয়া, গবেষক এবং জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মতামতের প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে।
আগামীর পথরেখা
প্রতিবেদনে প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর গুণগত মান বৃদ্ধিতে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। বৈঠকে উপস্থিত মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়া এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই সুপারিশমালা দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেন প্রধান উপদেষ্টা।
ড. ইউনূসের এই কড়া বার্তা এবং কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ মূলত রাষ্ট্র সংস্কারের সেই বৃহত্তর প্রক্রিয়ারই অংশ, যা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলে একটি আধুনিক ও জনবান্ধব প্রশাসন উপহার দেওয়াই এখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

