বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার বর্তমান সম্পর্ক যে খুব একটা ‘মসৃণ’ নয় এবং এক ধরনের অচলাবস্থা বা ‘থমকে থাকা’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করে নিয়েছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দুই দেশের বর্তমান কূটনৈতিক শীতলতার কথা তুলে ধরেন। তবে তিনি আশাবাদী যে, অন্তর্বর্তী সরকারের পর যে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে, তারা এই জট কাটিয়ে সম্পর্ককে আবার স্বাভাবিক গতিতে ফেরাতে সক্ষম হবে।
উপদেষ্টা মনে করেন, দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যের কারণেই এই স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। তিনি বিষয়টিকে কোনো বড় সংকট বলতে রাজি না হলেও সম্পর্কের গতি যে আশানুরূপ নয়, তা তার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
স্বার্থের সংঘাত ও দৃষ্টিভঙ্গির তফাত
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার শুরু থেকেই ভারতের সঙ্গে একটি কার্যকর ও সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করেছে। প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সরকারের প্রতিটি পর্যায়ে এই বিষয়ে ঐকমত্য ছিল। তিনি বলেন, “পারস্পরিক বোঝাপড়া ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা আসলে ভারতের সঙ্গে ভালো একটি কাজের সম্পর্ক চেয়েছি। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত সফলতা আসেনি, এটি আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে।”
এই পরিস্থিতির কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তৌহিদ হোসেন কাউকে এককভাবে দায়ী করতে নারাজ। তিনি মনে করেন, ভারত তাদের জাতীয় স্বার্থ যেভাবে দেখেছে এবং বাংলাদেশ যেভাবে নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে চেয়েছে—এই দুই ধারণার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে। আর এই তফাতটুকুই সম্পর্ককে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেখ হাসিনা ইস্যুতে নীরব ভারত
ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি না, এমন প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় উপদেষ্টাকে। তৌহিদ হোসেন বলেন, কূটনৈতিক বিষয়ে নৈরাশ্যবাদী হওয়ার সুযোগ নেই। সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো না কোনো পথ অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে।
শেখ হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার বিষয়ে ভারতের মনোভাব নিয়ে জানতে চাইলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “মনোভাব একটি বিমূর্ত বিষয়। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে ফেরত চেয়েছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত ভারত থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া (রেসপন্স) পাওয়া যায়নি। এর বাইরে কোনো ধরনের অনুমান বা স্পেকুলেশনে যাওয়া আমাদের ঠিক হবে না।”
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
বর্তমান সরকারের মেয়াদে বেশ কিছু ‘সেটব্যাক’ বা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা সম্পর্কের স্বাভাবিক গতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে বলে স্বীকার করেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। তবে তিনি মনে করেন, এই অমীমাংসিত ইস্যুগুলো চিরস্থায়ী নয়। তার মতে, উত্তরাধিকারী হিসেবে যে নতুন সরকার আসবে, তাদের সময়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে আবার একটি মসৃণ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হবে।
তিনি আরও যোগ করেন, “প্রতিটি দেশের সাথেই স্বার্থের সংঘাত বা বিভিন্ন ইস্যু থাকবেই। কিন্তু সেই সংঘাত এড়িয়ে একটি মসৃণ সম্পর্ক বজায় রাখাই কূটনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। আমাদের সময়টা হয়তো সেই অর্থে স্মুথ ছিল না, তবে ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য আমরা একটি ভিত্তি রেখে যেতে চাই।”
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৫ আগস্টের পর থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই বক্তব্য তারই আনুষ্ঠানিক প্রতিফলন। সীমান্তে হত্যা, পানিবণ্টন চুক্তি এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলো ঝুলে থাকায় দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তৌহিদ হোসেনের এই অকপট স্বীকারোক্তি ইঙ্গিত দেয় যে, বর্তমান সরকার এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই সামনের দিনগুলোতে কাজ করছে এবং পরবর্তী সরকারের হাতে একটি স্থিতিশীল কূটনৈতিক কাঠামো তুলে দিতে চায়।

