আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠের নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের আস্থা ফেরাতে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজনে ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ বা নির্ধারিত নিয়ম মেনে সর্বোচ্চ শক্তি বা বল প্রয়োগ করবে সশস্ত্র বাহিনী।
বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর গুলিস্তানে রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্সে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য নিশ্চিত করেন সেনাসদরের সামরিক অপারেশন্স পরিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল দেওয়ান মোহাম্মদ মনজুর হোসেন।
‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় নির্বাচনী মাঠে সেনাবাহিনীর কার্যক্রম এবং প্রস্তুতির আদ্যোপান্ত তুলে ধরতেই এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সেখানে সেনাসদরের এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্পষ্ট করেন যে, একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের স্বার্থে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেনাবাহিনী পিছপা হবে না।
ক্রমান্বয়ে বল প্রয়োগের নীতি
সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিকের প্রশ্নের প্রেক্ষিতে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন জানান, অন্যান্য বাহিনীর তুলনায় সেনাবাহিনীর কাজের ধরন ভিন্ন। তিনি বলেন, “সেনাবাহিনীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবে ‘রুলস অব এনগেজমেন্ট’ দেওয়া আছে। যদি কোথাও পরিস্থিতি এমন হয় যে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ প্রয়োজন, তবে আমরা আইনি কাঠামোয় থেকে ধাপে ধাপে বল প্রয়োগের মাত্রা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া অনুসরণ করব।”
বিজিবির পক্ষ থেকে ‘অতিরিক্ত বল প্রয়োগ না করার’ ঘোষণার প্রেক্ষিতে সেনাবাহিনীর অবস্থান জানতে চাইলে তিনি জানান, সেনাবাহিনী তার নিজস্ব বিধিমালা ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে বদ্ধপরিকর। বিশেষ করে কোনো ধরনের ‘মব’ বা গণ-উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা দিলে তা দমনে সশস্ত্র বাহিনী সব সময় প্রস্তুত।
জনগণের আস্থা ও সেনাপ্রধানের বার্তা
নির্বাচন নিয়ে জনমনে থাকা সংশয় দূর করতে খোদ সেনাপ্রধান দেশের বিভিন্ন বিভাগ সফর করেছেন। বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন বলেন, “সেনাপ্রধানের এই সফরের দুটি মূল উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, বেসামরিক প্রশাসনকে অভয় দেওয়া যে সেনাবাহিনী সব সময় সহায়তায় প্রস্তুত। দ্বিতীয়ত, সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করা যে তারা নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন।”
এবারের নির্বাচনে সেনাবাহিনী কেবল উপজেলা পর্যায়ে নয়, ক্ষেত্রবিশেষে কেন্দ্রভিত্তিক ক্যাম্প স্থাপন করেছে। এর ফলে বিশাল সংখ্যক টহল দল সার্বক্ষণিক মাঠে থাকতে পারবে, যা ভোটারদের মনে স্বস্তি ও আস্থার পরিবেশ তৈরি করবে বলে মনে করছে সেনাসদর।
‘থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট’ ও বিশেষ সরঞ্জাম
নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতা এবং বর্তমান পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে সেনাবাহিনী ইতিমধ্যে তাদের ‘থ্রেট অ্যাসেসমেন্ট’ বা সম্ভাব্য ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি করেছে। সেই অনুযায়ী সাজানো হয়েছে সেনা মোতায়েন পরিকল্পনা। এবারের নির্বাচনে সেনা সদস্যদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অ-ঘাতক অস্ত্র বা ‘নন-লেথাল ওয়েপন’ এবং দাঙ্গা দমনের সরঞ্জামের (রায়ট কন্ট্রোল ইকুইপমেন্ট) ওপর।
পরিচালক জানান, বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনী নতুন করে দাঙ্গা দমনের সরঞ্জাম সংগ্রহ করেছে। যেকোনো নাশকতা বা সহিংসতা প্রতিরোধের জন্য সশস্ত্র বাহিনী সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে এবং বেসামরিক প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে কাজ করছে।
পাহাড় ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ে সতর্কবার্তা
পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোকে নির্বাচনের সময় অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে সেনাবাহিনী। এসব এলাকায় নিয়মিত সেনা মোতায়েন থাকলেও নির্বাচনের আগে-পরে সেখানে বিশেষ নজরদারি এবং বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য সব ধরনের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই সাজানো হয়েছে নিরাপত্তা বলয়।
নিরপেক্ষতা ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা
নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মনজুর হোসেন অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, “বাংলাদেশ সেনাবাহিনী একটি সুশৃঙ্খল এবং দেশমাতৃকার সেবায় নিবেদিত বাহিনী। সেনাপ্রধান পরিষ্কার নির্দেশ দিয়েছেন—সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, সেনাবাহিনী যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করে, তবে তাদের নিরপেক্ষতা প্রমাণের জন্য আলাদা বার্তার প্রয়োজন নেই; সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমেই দেশের মানুষ তা বুঝতে পারবে। নির্বাচনে তথ্যপ্রযুক্তি বা সাইবার আক্রমণের বিষয়েও সেনাবাহিনী নিজস্ব প্রস্তুতি সেরে রেখেছে বলে জানান তিনি।

