রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে অভাব আর ঋণের জালে পিষ্ট এক পরিবারের করুণ পরিণতি দেখল প্রতিবেশীরা। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মিরপুর-১১ নম্বর এলাকার ওয়াপদা বিহারী ক্যাম্পের একটি জরাজীর্ণ টিনশেড ঘর থেকে দুই শিশু সন্তানসহ বাবা-মায়ের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। প্রাথমিক তদন্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা, দুই শিশু সন্তানকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর দম্পতি নিজেরাও আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছেন।
দুপুর ১টার দিকে ক্যাম্পের ‘বি’ ব্লকের ওই বাসা থেকে পুলিশ যখন মরদেহগুলো বের করে আনছিল, তখন পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। অভাবের তাড়নায় একটি সাজানো সংসার এভাবে নিভে যাবে, তা মেনে নিতে পারছেন না স্থানীয় বাসিন্দারা।
দারিদ্র্য ও ঋণের নিষ্ঠুর পরিহাস
নিহতরা হলেন— মোহাম্মদ মাসুম (৩৫), তার স্ত্রী ফাতেমা আক্তার সুমি (৩০) এবং তাদের দুই অবুঝ সন্তান ৪ বছর বয়সী মিনহাজ ও ২ বছর বয়সী আসাদ। মাসুম পেশায় একজন রিকশাচালক ছিলেন এবং সুমি অন্যের বাসায় কাজ করে সংসারের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করতেন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর টানাটানির সংসারে সেই চাকা যেন আর ঘুরছিল না।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানাচ্ছে, এই পরিবারটি বিভিন্ন ক্ষুদ্রঋণ দাতা সংস্থা বা স্থানীয় সমিতি থেকে বেশ কিছু টাকা ঋণ নিয়েছিল। অভাবের কারণে কিস্তি পরিশোধ করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। পাওনাদারদের ক্রমাগত চাপ আর প্রতিদিন দরজায় কিস্তির জন্য মানুষের আনাগোনা পরিবারটিকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল বলে ধারণা করছেন প্রতিবেশীরা।
যেভাবে জানা গেল ঘটনা
পুলিশ ও স্থানীয়দের মতে, আজ সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে কোনো এক সময় এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। দীর্ঘক্ষণ ঘর থেকে কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে এবং দরজা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। পরে পুলিশে খবর দেওয়া হলে তারা এসে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে চারজনের নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে।
পল্লবী থানার ডিউটি অফিসার এএসআই শাহীন আলম জানান, খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন পাওয়া গেলেই মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান
বিহারী ক্যাম্পের ওই ব্লকের বাসিন্দারা জানান, মাসুম অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের মানুষ ছিলেন। ঋণের দায়ে তিনি গত কয়েকদিন ধরে বেশ বিমর্ষ থাকতেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী বলেন, “প্রতিদিনই কেউ না কেউ কিস্তির টাকার জন্য আসত। একটা রিকশা চালিয়ে আর মানুষের বাড়ি কাজ করে কত টাকাই বা পাওয়া যায়? হয়তো কোনো উপায় না পেয়ে সন্তানদের নিয়ে এই পথ বেছে নিয়েছেন তারা।”
আশপাশের মানুষজন বলছেন, দুই বছর ও চার বছরের শিশু দুটি ঠিকমতো পৃথিবীর আলো দেখার আগেই বাবার হাতে প্রাণ হারালো—এটি ভাবতেই শিউরে উঠছেন সবাই। দারিদ্র্য যে মানুষকে কতটা অসহায় করে তুলতে পারে, পল্লবীর এই ঘটনা তারই এক নির্মম দালিলিক প্রমাণ হয়ে রইল।
পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এটি হত্যাকাণ্ড নাকি আত্মহত্যা, তা নিশ্চিত করতে সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিটকেও খবর দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে পুলিশ নিহতের স্বজনদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। পল্লবী থানায় এই ঘটনায় একটি অপমৃত্যু বা হত্যার মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
রাজধানীর বুকে এমন একটি ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে নিম্নবিত্ত মানুষের জীবন সংগ্রামের ভয়াবহতা এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের মরণফাঁদ কতটা ভয়ংকর হতে পারে।

