বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায় সৃষ্টিকারী ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’-এর সময় নিহত অজ্ঞাতপরিচয় ১৮২ জন শহীদের মরদেহ উত্তোলনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে গণকবর দেওয়া এই শহীদদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের লক্ষ্যেই এই নিবিড় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২ ডিসেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে অবস্থিত রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দেখা যায়, যেখানে অজ্ঞাতপরিচয় শহীদদের গণকবর রয়েছে, সেই সমগ্র এলাকাটি সিআইডির ‘ক্রাইমসিন ইউনিট’-এর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে ঘিরে রাখা হয়েছে। নিহতদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের জন্য আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে সংস্থাটি। এই মরদেহ উত্তোলনের প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে কবরস্থানের অভ্যন্তরে অস্থায়ী তাঁবু স্থাপন করা হয়েছে।
সিআইডি সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুসারে, এই অস্থায়ী তাঁবুতেই উত্তোলন করা মরদেহগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ময়নাতদন্তের প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করা হবে। সংগৃহীত ডিএনএ নমুনাগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে, যার মাধ্যমে শহীদদের পরিচয় নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে। পরবর্তীতে, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে মরদেহগুলো পুনরায় দাফন করা হবে।
অজ্ঞাতনামা শহীদদের মরদেহ উত্তোলন ও পরিচয় শনাক্তকরণের এই উদ্যোগটি আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশে শুরু হয়েছে। গত ৪ আগস্ট (সোমবার) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই গুরুত্বপূর্ণ আদেশটি জারি করেন।
আদালতে পুলিশের পক্ষ থেকে এই মর্মে আবেদনটি পেশ করেন মোহাম্মদপুর থানার উপ-পরিদর্শক মাহিদুল ইসলাম। তাঁর আবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে জন্ম নেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে বহুসংখ্যক নারী-পুরুষ নিহত হন, যাঁদের অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। আইনানুগ প্রক্রিয়া এবং মানবিক দিক বিবেচনা করে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য কবর থেকে মরদেহগুলো উত্তোলন করে ফরেনসিক পরীক্ষা ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা অত্যাবশ্যক। এই আবেদনের যৌক্তিকতা বিবেচনা করেই বিজ্ঞ আদালত মরদেহ উত্তোলনের নির্দেশ প্রদান করেন।
এই স্পর্শকাতর ও জটিল প্রক্রিয়ায় সিআইডি’র ফরেনসিক ইউনিটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ফরেনসিক দলও সহযোগিতা করবে বলে সিআইডি সূত্র জানিয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় শহীদদের পরিচয় শনাক্তকরণে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ এবং এর ফল প্রকাশের জন্য একটি দীর্ঘ ও সতর্কতাপূর্ণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এই কারণে, গণকবর থেকে মরদেহ উত্তোলন ও ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের কাজ শেষ হতে কমপক্ষে এক মাস কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মরদেহ উত্তোলনের প্রথম দিন সিআইডি’র প্রধানসহ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকবেন। এই পদক্ষেপ কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, এটি একইসঙ্গে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি এক গভীর সংবেদনশীল দায়বদ্ধতার বহিঃপ্রকাশ। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শন এবং তাঁদের পরিবার-পরিজনদের কাছে তাঁদের পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়ার এক মহৎ প্রচেষ্টা শুরু হলো। এই পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া ইতিহাসের সত্যকে উন্মোচন এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি স্থাপন করবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
২০২৪ সালের জুলাই মাসে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দ্রুতই একটি গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়, যা তৎকালীন সরকারের পতনের অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। এই অভ্যুত্থানের সময় দেশজুড়ে ব্যাপক সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থানে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে বহু মানুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে অনেকে ছিলেন, যাঁদের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। মানবিক বিবেচনায় এবং আইনি প্রক্রিয়া সাপেক্ষে তাঁদেরকে ‘শহীদ’ হিসেবে রায়েরবাজার কবরস্থানে দাফন করা হয়। তখন থেকেই এসব অজ্ঞাতপরিচয় শহীদদের পরিচয় নিশ্চিত করার দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আদালতের নির্দেশে সেই আকাঙ্ক্ষিত প্রক্রিয়াটি অবশেষে শুরু হলো, যা শহীদ পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বস্তি ও আশার সঞ্চার করেছে। এটি বাংলাদেশের জনগণের কাছে একটি সংবেদনশীল ও গভীর আগ্রহের বিষয়, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

