সমুদ্রতীরের শহর কক্সবাজারে আজ রাজনীতির এক নতুন উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বাহারছড়া বীর মুক্তিযোদ্ধা চত্বরে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর এবং ১১ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা ডা. শফিকুর রহমান দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে এক কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, উত্তরাধিকার সূত্রে ক্ষমতা দখলের পুরনো সংস্কৃতি এখন ইতিহাসের গর্ভে বিলীন হওয়ার পথে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “রাজার ছেলে রাজা হবে—এই রাজনীতি আমরা আর চাই না। আমাদের দেশ মেধাবীদের। তাদেরই এগিয়ে আসার সুযোগ দিতে হবে।” তিনি একটি ইনসাফপূর্ণ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন, যেখানে মানুষের মেধা ও যোগ্যতাই হবে মূল মাপকাঠি।
আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনকে তিনি কেবল একটি সাধারণ ভোট হিসেবে দেখতে নারাজ। তার মতে, এই নির্বাচন হলো গত জুলাই মাসে রাজপথে রক্ত দেওয়া তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের লড়াই। তিনি উপস্থিত জনতাকে মনে করিয়ে দেন যে, এবারের ভোট আগের কোনো কলঙ্কিত নির্বাচনের মতো নয়; এটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষার পরীক্ষা।
ডা. শফিকুর রহমান তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ডাকসু থেকে জাকসু পর্যন্ত সারা দেশের ছাত্রসমাজ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে তারা আর ‘বস্তাপচা’ ও পচে যাওয়া রাজনীতির অংশ হবে না। তিনি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধাদের প্রতি, যাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ আহতরা উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে পারছেন।
জনসভায় মা-বোনদের মর্যাদার বিষয়টিও গুরুত্বের সাথে উঠে আসে। জামায়াত আমীর বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি ১১ দলীয় জোট জয়ী হলে দেশের নারীদের সম্মান হবে আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।” তিনি আরও যোগ করেন, যে জাতি তার মা ও বোনদের সম্মান দিতে জানে না, সৃষ্টিকর্তার রহমত সেই জাতির ওপর বর্ষিত হয় না।
দেশের বেকারত্ব সমস্যার সমাধানে তিনি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি বলেন, যুবকদের হাতে কর্মসংস্থান তুলে দিয়ে তাদের একটি শক্তিশালী ও গর্বিত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। একইসাথে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের অপপ্রচারের নিন্দা জানিয়ে বলেন, চোরের মতো পেছন থেকে যারা নোংরামি করছে, তারা ইতিহাসেই পিছিয়ে থাকবে।
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রসঙ্গে তিনি ব্যাংক ঋণখেলাপিদের কঠোর সমালোচনা করেন। ডা. শফিকুর বলেন, “বগলে ঋণখেলাপি রেখে আপনি কখনো দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন না।” প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের জনগণের সেবক হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শহীদ আবু সাঈদ ও শহীদ ওসমান হাদীর খুনিদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। তবে কেউ যদি ভুল স্বীকার করে মূলধারায় ফিরতে চায়, তাদের বিবেচনার সুযোগ থাকবে।
কক্সবাজারের উন্নয়ন নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত থাকা সত্ত্বেও কেন কক্সবাজার সিঙ্গাপুরের মতো আধুনিক হতে পারল না? তার উত্তর ছিল সোজাসাপ্টা—ব্যাংক ডাকাত আর লুটেরাদের কারণে এই শহর পিছিয়ে আছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন যে, পাচার করা সব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে এবং কক্সবাজারকে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন ও শিক্ষা নগরী হিসেবে গড়ে তোলা হবে।
সমাবেশে উপস্থিত ডাকসুর সাবেক জিএস এস এম ফরহাদ তার বক্তব্যে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, অতীতের হত্যা ও ধর্ষণের রাজনীতি এই জোটে নেই। তিনি ভোটারদের ‘দাঁড়িপাল্লা’ ও ‘হাঁস’ প্রতীকে ভোট দিয়ে নতুন পরিবর্তনের অংশ হওয়ার আহ্বান জানান।
উখিয়া-টেকনাফ আসনের প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা নূর আহমদ আনোয়ারী এবং কক্সবাজার সদর আসনের শহীদুল আলম বাহাদুর দেশের ৫৪ বছরের লুটপাট ও দুর্নীতির ইতি টানার শপথ করেন। তারা বিশ্বাস করেন, ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বই পারে এই স্থবিরতা ভাঙতে।
জুলাই বিপ্লবের অন্যতম মুখ ডাক্তার মাহমুদা মিতু সমাবেশে তার ব্যক্তিগত লড়াইয়ের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সত্যের পথে চলায় তাকে নানাভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, কিন্তু নতুন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে তিনি অবিচল। চকরিয়া-পেকুয়া আসনের প্রার্থী আব্দুল্লাহ আল ফারুক শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে আমূল পরিবর্তনের কথা বলেন।
সকাল থেকেই বাহারছড়া চত্বর কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে এক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। জেলা সেক্রেটারি জাহেদুল ইসলামের পরিচালনায় এবং ক্বারী আব্দুল্লাহ আল মামুনের কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সমাবেশে জাগপা নেতা রাশেদ প্রধান, এবি পার্টির জাহাঙ্গীর কাসেম এবং ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ সিবগাসহ জোটের স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতারা বক্তব্য রাখেন।
বক্তব্যের শেষে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “গণভোট মানেই স্বাধীনতা।” ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পরিবর্তনের পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য তিনি সকলের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান।

