রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে ঋণের নামে ১৩৬ কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মুখোমুখি হয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। রোববার বিকেলে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে তাকে কারাগার থেকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। চার দিনের রিমান্ডের প্রথম দিনেই তাকে ছকবদ্ধ জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি করেছে সংস্থাটির একটি বিশেষ অনুসন্ধান দল।
রোববার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে একটি প্রিজন ভ্যানে করে সালমান এফ রহমানকে সেগুনবাগিচায় দুদকের কার্যালয়ে আনা হয়। সংস্থার উপপরিচালক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন এবং সহকারী পরিচালক মো. আল আমিনের নেতৃত্বে একটি তদন্তকারী দল তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। গত ৮ জানুয়ারি দায়ের করা এই মামলায় আদালত তার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছিলেন, যার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া আজ থেকে শুরু হলো।
দুদকের দায়ের করা এই মামলায় সালমান এফ রহমান ছাড়াও আরও ২১ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় রয়েছেন তার ভাই এ এস এফ রহমান, ছেলে আহমেদ শায়ান ফজলুর রহমান এবং ভাতিজা আহমেদ শাহরিয়ার রহমান। এছাড়া বেক্সিমকো গ্রুপের একাধিক পরিচালক এবং জনতা ব্যাংকের তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও এই অর্থ আত্মসাৎ প্রক্রিয়ায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, আসামিরা ক্ষমতার অপব্যবহার করে পরস্পর যোগসাজশে ‘কোজি অ্যাপারেলস লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে জনতা ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের ব্যবসা পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। নথিপত্রে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘নবসৃষ্টি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও মূলত ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে নিজেদের মধ্যেই ভুয়া আমদানি-রপ্তানি দেখিয়ে অ্যাকোমডেশন বিল তৈরি করা হয়।
তদন্তকারীদের দাবি, এই প্রক্রিয়ায় মোট ১৩৬ কোটি ৬৭ লাখ ৫৮ হাজার ৯৩১ টাকা ব্যাংক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং পরবর্তীতে তা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। ঋণের নামে নেওয়া এই অর্থ কোনো উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় না করে ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রমাণ পেয়েছে দুদক। আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির প্রতারণা ও জালিয়াতি ধারা এবং মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের কঠোর ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার আসামিদের তালিকায় জনতা ব্যাংকের তৎকালীন সিইও আব্দুছ ছালাম এবং সাবেক এমডি আব্দুল জব্বারসহ বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার নাম রয়েছে। দুদকের অভিযোগ, ব্যাংকের এই কর্মকর্তারা পর্যাপ্ত জামানত বা যাচাই-বাছাই ছাড়াই প্রভাবশালীদের চাপে কিংবা অনৈতিক সুবিধা নিয়ে এই ঋণের অনুমোদন দিয়েছিলেন। পেশাদার ব্যাংকিং রীতিনীতি লঙ্ঘন করে রাষ্ট্রীয় অর্থের এই হরিলুট চালানো হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সালমান এফ রহমান ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। গত ১৭ বছরে দেশের আর্থিক খাতে তার একচ্ছত্র আধিপত্য এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তার বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির মামলা দায়ের হচ্ছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, প্রথম দিনের জিজ্ঞাসাবাদে সালমান এফ রহমানের কাছে কোজি অ্যাপারেলসের ঋণের উৎস এবং ব্যাংকিং নথিপত্রের অসঙ্গতি নিয়ে জানতে চাওয়া হয়। তবে তিনি অধিকাংশ প্রশ্নের উত্তরে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি বা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। রিমান্ডের বাকি দিনগুলোতে তাকে অন্যান্য আসামিদের সাথে মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পরিকল্পনাও রয়েছে তদন্তকারী দলের।
দেশের ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং বড় বড় ঋণ খেলাপারিদের আইনের আওতায় আনতে এই মামলাটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। জনতা ব্যাংকের এই বিপুল পরিমাণ অর্থ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় থাকলেও আইনি প্রক্রিয়া কঠোরভাবে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর দুর্নীতি দমন কমিশন।

