বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ রপ্তানি বাণিজ্য। আর এই বাণিজ্যের সিংহভাগজুড়ে থাকা ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা বজায় রাখা এখন সময়ের দাবি। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে চূড়ান্ত উত্তরণের পর এই বিশেষ সুবিধা হারানোর যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলায় ইইউ-এর সঙ্গে দ্রুত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএ (FTA) আলোচনার ডাক দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।
রোববার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ইউরোপীয় চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচ্যাম)-এর চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতে প্রধান উপদেষ্টা এই গুরুত্বারোপ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলারও উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্ট করে বলেন, এলডিসি উত্তরণের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজারগুলোতে বিদ্যমান সুবিধা সুরক্ষিত রাখা আমাদের অগ্রাধিকার।
অধ্যাপক ইউনূস সম্প্রতি জাপানের সঙ্গে সম্পন্ন হওয়া অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (EPA) সাফল্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটিতে এখন সাত হাজার তিনশর বেশি বাংলাদেশি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে। জাপানের সঙ্গে এই চুক্তি আমাদের জন্য একটি মাইলফলক। আমরা এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গেও একই ধরনের সফল আলোচনায় বসতে চাই, যাতে আমাদের তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য প্রধান রপ্তানি পণ্যগুলো দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা পায়।
বৈঠকে ইউরোচ্যাম চেয়ারপারসন নুরিয়া লোপেজ বাংলাদেশের উদ্বেগের সঙ্গে সহমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, এলডিসি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ যদি এখনই কোনো চুক্তিতে না পৌঁছায়, তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভারত ও ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি জানান, ভারত ইতোমধ্যে ইইউ-এর সঙ্গে এফটিএ চূড়ান্ত করছে এবং ভিয়েতনাম আগে থেকেই এই সুবিধা ভোগ করছে। বাংলাদেশকেও তাই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
ইউরোপীয় বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে বর্তমান সরকার বেশ কিছু সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে বলে বৈঠকে জানানো হয়। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমরা বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক উৎপাদন হাবে পরিণত করতে চাই। আমাদের দক্ষ শ্রমশক্তি ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়ের সুবিধা নিতে ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো তাদের কারখানা এখানে স্থানান্তর করতে পারে।” তিনি আরও জানান, সরকার বর্তমানে বিশেষ মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তোলার কাজ ত্বরান্বিত করছে।
ইইউ রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার জানান, এলডিসি উত্তরণের পরও বাংলাদেশের জন্য ২০২৯ সাল পর্যন্ত বর্তমান শুল্কমুক্ত সুবিধা বহাল থাকবে। তবে এর পরবর্তী সময়টুকুকে নির্বিঘ্ন করতে ২০২৬ সালে একটি ‘ইইউ-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরাম’ আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে আসার আগে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক সংকেত চায়, যেখানে তারা ব্যবসা করার সমান সুযোগ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারবে।
বাণিজ্যিক আলোচনার পাশাপাশি বৈঠকে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়েও কথা হয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় পরিসরে পর্যবেক্ষক পাঠানোর সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিদেশি পর্যবেক্ষকদের এই অংশগ্রহণ বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ও শক্তিশালী বার্তা দেবে।
বৈঠকের শেষে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রায় অর্ধেক জোগান দেওয়া ইউরোপীয় বাজারের জন্য একটি টেকসই আইনি কাঠামো বা এফটিএ এখন সময়ের প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। ২০২৯ সালের পর শুল্কের বোঝা যাতে পোশাক শিল্পকে বিপদে না ফেলে, সেজন্যই এখন থেকে কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।

