চব্বিশের রক্তঝরা জুলাইয়ে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে তিন আন্দোলনকারীকে নৃশংসভাবে হত্যার দায়ে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সোমনাথ সাহাসহ ৯ জনের বিরুদ্ধে আনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বিচারের ধারায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনাল আসামিদের উপস্থিতির জন্য আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন।
রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ প্রদান করেন। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। শুনানির শুরুতে প্রসিকিউশন পক্ষ ঘটনার ভয়াবহতা ও আসামিদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণাদি তুলে ধরেন।
আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি পরিচালনা করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই গৌরীপুরে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন তুঙ্গে, তখন তৎকালীন উপজেলা চেয়ারম্যান ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সোমনাথ সাহার প্রত্যক্ষ নির্দেশে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। এই নারকীয় ঘটনায় তিনজন আন্দোলনকারী প্রাণ হারান।
চিফ প্রসিকিউটর শুনানিতে একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন এক উপ-পরিদর্শক (এসআই) অত্যন্ত কাছ থেকে একজন ‘জুলাই যোদ্ধার’ মাথায় ও বুকে গুলি চালিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডকে নিছক দায়িত্ব পালন নয়, বরং পরিকল্পিত মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রসিকিউশন। এই দাবির সপক্ষেই আজ আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র (ফরমাল চার্জ) দাখিল করা হয়।
আদালত এই অভিযোগ আমলে নিয়ে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন। জানা গেছে, এই মামলার ৯ জন আসামির মধ্যে ৩ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বাকি ৬ জন পলাতক আসামিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করে আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ট্রাইব্যুনালে হাজির করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—গৌরীপুর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন চন্দ্র রায়, এএসআই দেলোয়ার হোসেন এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সানাউল। প্রসিকিউশনের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছিল, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আইনের আওতায় বিচারযোগ্য।
আদালত কক্ষের বাইরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, “আমরা প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করছি। গৌরীপুরের এই ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত পৈশাচিক। ক্ষমতার দম্ভে সাধারণ মানুষের বুকে যেভাবে গুলি চালানো হয়েছে, তার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। অভিযোগ আমলে নেওয়া সেই প্রক্রিয়ারই প্রথম ধাপ।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবারের সদস্যরা এই আদেশে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। তারা আশা করছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই বিচারের মাধ্যমে অপরাধীরা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পাবে। গৌরীপুর এলাকায় এখনো সেই দিনের সেই দুঃসহ স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন অনেকে, যেখানে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছিল তরুণদের রক্তে।
আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনালে আসামিদের হাজির করার পর মামলার পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম বা ট্রায়াল শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। গৌরীপুরের এই মামলার রায় জুলাই গণহত্যার বিচারের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

