বিশাল জনপদ আর সীমাবদ্ধ সংস্থান—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা যে এক হিমালয়সম চ্যালেঞ্জ, আজ সেই রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে আনলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)। আজ দুপুরে চট্টগ্রাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে তিনি দেশের চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি খানিকটা রসিকতা আর খানিকটা অনুযোগের সুরে বলেন, “আপনারা প্রায়ই অভিযোগ করেন আমরা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না। কিন্তু বাস্তবতা দেখুন, এখানে অল্প কয়েকজন সাংবাদিক কথা বলছেন, তাদের থামাতেই কত সময় লেগে যায়! সেখানে ১৮ কোটি মানুষের এই বিশাল দেশে শৃঙ্খলা রক্ষা করা কতটা ‘ডিফিকাল্ট’ কাজ, তা সহজেই অনুমেয়।”
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে দেশবাসীর উৎকণ্ঠার জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা স্পষ্ট আশ্বাসের বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, বাহিনীর প্রস্তুতি বর্তমানে অত্যন্ত শক্তিশালী। যদি এই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ এগোয়, তবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি একটি অভূতপূর্ব সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্ভব হবে। নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিয়ে কোনো তর্কের সুযোগ থাকবে না বলেও তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বিগত শাসন আমলের সঙ্গে বর্তমানের এক তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, অতীতে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে ভয় পেতেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস হতো না। কিন্তু আজ সেই দেয়াল ভেঙে গেছে। এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটে মানুষ যে পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করছে, তা আগে কখনো ছিল না।
ইন্টারনেট ও ফেসবুক বন্ধের গুজব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, “বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট বন্ধ করা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। কেউ যদি এ ধরনের হঠকারী পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করে, তবে তাকে রেহাই দেওয়া হবে না। আমরা চাই সবাই স্বাধীনভাবে লিখুক ও নিজের মত প্রকাশ করুক।”
নির্বাচনী সহিংসতা নিয়ে উপদেষ্টার বিশ্লেষণ ছিল কিছুটা ভিন্ন। তিনি দাবি করেন, বর্তমানে যেসব সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে, তার সিংহভাগই রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল। রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তবে পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন ও বাহিনীর সদস্যদের সর্বোচ্চ নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রামের সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ এখন সমন্বিতভাবে কাজ করছে। বন্দরে নগরীর স্থিতিশীলতা রক্ষায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা ‘মব জাস্টিস’ বরদাশত করা হবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ফোর্সের সংখ্যা যেমন বাড়ানো হয়েছে, তেমনি প্রযুক্তির ব্যবহারও জোরদার করা হচ্ছে।
এদিনের সভায় চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞাসহ প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ওপর কোনো রাজনৈতিক চাপ নেই বলেও সভায় পুনরায় আশ্বস্ত করেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।
১৮ কোটি মানুষের এই বৈচিত্র্যময় জনপদে শতভাগ নিরাপত্তা দেওয়া কঠিন হলেও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরিতে বদ্ধপরিকর—চট্টগ্রামের এই সফর থেকে উপদেষ্টা ঠিক এমন বার্তাই পৌঁছে দিতে চেয়েছেন দেশবাসীর কাছে।

