খসড়া ‘জাতীয় গণমাধ্যম কমিশন’ ও ‘সম্প্রচার কমিশন’ অধ্যাদেশকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারের কঠোর সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি এই উদ্যোগকে মুক্ত গণমাধ্যম বিকাশের পথে অন্তর্বর্তী সরকারের এক ধরণের ‘বিদায়ী পরিহাস’ বলে অভিহিত করেছে। সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের এমন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরির চেষ্টায় গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
শনিবার (৩১ জানুয়ারি) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে টিআইবি জানায়, প্রস্তাবিত দুটি কমিশনের গঠন ও প্রশাসনিক কাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এগুলো সম্পূর্ণভাবে আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বাধীন। টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “এই কমিশনের কমিশনারদের পদমর্যাদা থেকে শুরু করে আর্থিক ব্যবস্থাপনা—সবই সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি স্বাধীন গণমাধ্যম ও সম্প্রচার বিকাশের জনআকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।”
টিআইবি’র মতে, এই বিষয়টি হতাশাজনক হলেও তাদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল না। সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের পুরো সময়জুড়ে গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার একটি প্রবণতা দেখা গেছে। গণমাধ্যমের ওপর সহিংসতা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা রোধে সরকার কেবল ব্যর্থই হয়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইন্ধন দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এসে এই দুটি খসড়া অধ্যাদেশ সেই নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণেরই চূড়ান্ত প্রতিফলন।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, সরকার গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলোকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করেছে। সংস্কার কমিশন গবেষণা ও অংশীজনদের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে একটি অভিন্ন ও সম্পূর্ণ স্বাধীন ‘গণমাধ্যম কমিশন’ গঠনের সুপারিশ করেছিল। অথচ সরকার দুটি পৃথক নিয়ন্ত্রণমূলক সংস্থা গঠনের পথে হাঁটছে, যা দীর্ঘমেয়াদে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য হুমকিস্বরূপ। ড. ইফতেখারুজ্জামান এই উদ্যোগকে ‘অপরিণামদর্শী’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
টিআইবি বর্তমান সরকারকে এই তড়িঘড়ি করে তৈরি করা খসড়া দুটিকে অধ্যাদেশে পরিণত না করার জোর আহ্বান জানিয়েছে। একইসঙ্গে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও একটি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, অতীতে যারা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের শিকার হয়েছে, সেইসব দলগুলোর উচিত নতুন সংসদ গঠনের পর একটি প্রকৃত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অভিন্ন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া।
সংস্থাটি মনে করে, কেবলমাত্র পেশাদারিত্ব ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমেই দেশে মুক্ত গণমাধ্যম ও স্বাধীন সম্প্রচার ব্যবস্থার জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বন্দি কোনো কমিশন কখনোই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারবে না। সরকারের এই শেষ মুহূর্তের পদক্ষেপটি তাই গণতন্ত্রের পথে অন্তরায় হিসেবেই দেখছে দুর্নীতিবিরোধী এই সংস্থাটি।

