জুলাই অভ্যুত্থানের সেই অকুতোভয় তরুণরাই একদিন বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্ব দেবে—এমনই এক প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বুধবার দুপুরে রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘ডিজিটাল ডিভাইস অ্যান্ড ইনোভেশন এক্সপো-২০২৬’-এর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, জুলাই আন্দোলন দেশের রাজনীতিতে যেভাবে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল, তেমনি এই ইনোভেশন এক্সপো তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বিপ্লব ঘটাবে। তিনি মনে করিয়ে দেন, গত জুলাইয়ে আন্দোলনের সময় যখন ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেই ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতাই এক মহাশক্তিশালী সরকারের পতনের মুহূর্তকে ত্বরান্বিত করেছিল। ইন্টারনেটের যে শক্তি এবং তরুণের যে মেধা—এই দুইয়ের সমন্বয়েই বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে।
বক্তব্যের শুরুতেই ডিজিটাল খাতের গুরুত্ব তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, “বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল খাতই হলো সব পরিবর্তনের মূল চাবিকাঠি। শিক্ষা থেকে কৃষি—সব ক্ষেত্রই এখন এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।” তিনি আক্ষেপ করে বলেন, অতীতে নাগরিক সেবার ডিজিটাইজেশনের কথা কাগজে-কলমে অনেক বলা হলেও বাস্তবে তার সুফল সাধারণ মানুষ পায়নি। সরকারের কাজ হওয়া উচিত কেবল একটি কার্যকর সিস্টেম বা পদ্ধতি তৈরি করে দেওয়া, যা সাধারণ মানুষ নিজের মতো করে ব্যবহার করবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পিছিয়ে পড়া অঞ্চলের শিক্ষার উন্নয়ন নিয়ে কথা বলতে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, পাহাড়ের তিন জেলায় আড়াই হাজার স্কুলের মধ্যে মাত্র ১২টিতে ইন্টারনেট ছিল, যা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। তিনি বিশ্বাস করেন, যেখানে যোগ্য শিক্ষকের অভাব রয়েছে, সেখানে ইন্টারনেটই হতে পারে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। প্রযুক্তির আলো পৌঁছালে পাহাড়ের শিশুরাও বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে।
তরুণ প্রজন্মের জন্য ক্যারিয়ার বিষয়ক এক বৈপ্লবিক ধারণা পেশ করেন এই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, “সবার জন্য চাকরি নিশ্চিত করার ধারণাটি আসলে এক ধরনের আধুনিক দাস প্রথা। আমাদের তরুণদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার কেবল সেই পথটা সুগম করে দেবে যাতে মেধাবী তরুণরা নিজেরাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে।
সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মকাল নিয়েও নিজের চিন্তা প্রকাশ করেন ড. ইউনূস। তিনি মনে করেন, একজন কর্মকর্তার একই ধরনের পদে পাঁচ বছরের বেশি থাকা উচিত নয়। কারণ দীর্ঘ সময় এক জায়গায় থাকলে মানুষের সৃজনশীলতা নষ্ট হয় এবং একটি নির্দিষ্ট ‘মাইন্ড সেট’ তৈরি হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি ১০ বছর পর পর নতুন করে ঢেলে সাজানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে লক্ষ্য বদলালেও মানুষ পুরোনো ধারণা আঁকড়ে পড়ে থাকে, যা উন্নয়নের পথে বাধা।
দেশের ভাবমূর্তি নিয়ে সতর্কবাণী দিয়ে ড. ইউনূস আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, অতীতে জালিয়াতি ও দুর্নীতির কারণে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের সম্মান ক্ষুণ্ন হয়েছে। তিনি বলেন, “প্রযুক্তিতে উৎকর্ষ সাধন করতে হলে এই জালিয়াতি প্রথা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। আমরা বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই এবং আমাদের সেই সামর্থ্য ষোলোআনাই আছে।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষ তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, উদ্যোক্তা এবং কয়েক হাজার শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার এই অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ জুলাই আন্দোলনের স্পিরিটকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে বলে মনে করছেন উপস্থিত তরুণ উদ্ভাবকরা।

