যশোর কারাগারের ফটকে অ্যাম্বুলেন্সে রাখা মৃত স্ত্রী ও নয় মাস বয়সী শিশুপুত্রকে শেষবারের মতো দেখার সেই হৃদয়বিদারক দৃশ্যের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার আইনি স্বস্তি পেলেন বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন) সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দাম। মানবিক দিক বিবেচনা করে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) হাইকোর্ট তাকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন মঞ্জুর করেছেন। বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি আজিজ আহমেদ ভূঞার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
আদালতে সাদ্দামের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা। শুনানি শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, সাদ্দামের বিরুদ্ধে বাগেরহাটে দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের একটি মামলায় এই জামিন দেওয়া হয়েছে। এর আগে অন্য মামলাগুলোতেও তিনি জামিন পেয়েছিলেন। ফলে এই আদেশের পর তার কারাগার থেকে মুক্তি পেতে আর কোনো আইনি বাধা থাকছে না। আইনজীবী বলেন, “একসাথে স্ত্রী ও কোলের সন্তানকে হারানো একজন মানুষের মানসিক অবস্থা ও মানবিক দিকটি আদালত অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছেন।”
গত শুক্রবার বিকেলে বাগেরহাটের বেখেডাঙ্গা গ্রামে সাদ্দামের নিজ বাড়ি থেকে তার স্ত্রী কানিজ সুরভানা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই সঙ্গে পাশে পড়ে ছিল তাদের নয় মাস বয়সী পুত্রসন্তান নাজিমের নিথর দেহ। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, স্বামী দীর্ঘদিন কারাবন্দি থাকায় এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে তৈরি হওয়া তীব্র বিষণ্নতা থেকে স্বর্ণালী প্রথমে সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এই মর্মান্তিক সংবাদটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে ব্যাপক সমবেদনা ও আলোচনার সৃষ্টি হয়।
গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাদ্দামকে গোপালগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর থেকে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে শেষবারের মতো স্ত্রী-সন্তানকে দেখার জন্য প্যারোলে মুক্তির আবেদন জানানো হলেও তা নাকচ করে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে গত ২৪ জানুয়ারি সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যরা অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ দুটি কারাগারের গেটে নিয়ে যান।
কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া মাত্র পাঁচ মিনিটের অনুমতিতে কারাগারের গেটের ভেতর অ্যাম্বুলেন্সে রাখা প্রিয়জনদের মুখ শেষবারের মতো দেখার সুযোগ পান সাদ্দাম। সেই পাঁচ মিনিটে সেখানে এক অবর্ণনীয় ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, উপস্থিত কারারক্ষী থেকে শুরু করে পরিবারের স্বজন—সবার চোখেই তখন জল ছিল। প্যারোলে মুক্তি না দিয়ে এভাবে মরদেহ কারাগারের গেটে আনার বিষয়টি নিয়ে নাগরিক সমাজের অনেকেই প্রশাসনের সমালোচনা করেছিলেন।
হাইকোর্টের আজকের এই জামিন আদেশ মূলত সেই মানবিক সংকটেরই একটি আইনি প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আদালতের পর্যবেক্ষণেও শোকগ্রস্ত এই ব্যক্তির বর্তমান মানসিক অবস্থার বিষয়টি উঠে এসেছে। দীর্ঘ কয়েক মাস পর সাদ্দাম যখন কারামুক্ত হয়ে ঘরে ফিরবেন, তখন সেখানে তার অপেক্ষায় থাকার মতো প্রিয় মুখগুলো আর বেঁচে নেই—এই রূঢ় বাস্তবতাই এখন তার পরিবারের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, জামিনের কাগজপত্র দ্রুত যশোর কারাগারে পাঠানো হবে। সব ঠিক থাকলে আজ বা কালকের মধ্যেই তিনি মুক্তি পেতে পারেন। তবে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতা হওয়ায় এলাকায় ফেরার পর তার নিরাপত্তা এবং আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপগুলো নিয়েও সতর্ক রয়েছে প্রশাসন। শোক আর আইনি লড়াইয়ের এই অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে সাদ্দামের এই মুক্তি যেন এক বিষাদময় অধ্যায়ের উপসংহার।

