সম্প্রতি আঘাত হানা ভূমিকম্পে ঢাকা মেট্রোরেলের (Mass Rapid Transit- MRT) অবকাঠামোগত কোনো ভৌত সরণ বা স্থানচ্যুতি (ফিজিক্যাল ডিসপ্লেসমেন্ট) ঘটেনি বলে নিশ্চিত করেছে এর নির্মাণ ও পরিচালনাকারী সংস্থা ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফারুক আহমেদ আজ সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে এই তথ্য জানিয়েছেন, যা মেট্রোরেল ব্যবহারকারী এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে তৈরি হওয়া উদ্বেগ নিরসনে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
রাজধানীর উত্তরায় ডিএমটিসিএল-এর সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এই জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভূমিকম্পের পর গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো পরীক্ষা পদ্ধতির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ডিএমটিসিএল-এর প্রধান অগ্রাধিকার।
মো. ফারুক আহমেদ জানান, শক্তিশালী ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর পরই মেট্রোরেল পরিষেবা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। জনসাধারণের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি তাৎক্ষণিকভাবে বিশেষ নিরাপত্তা প্রোটোকল অনুসরণ করে।
তিনি বলেন, “আমরা শুরু থেকেই এই বিষয়ে স্পষ্ট ছিলাম যে, কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটলে সবার আগে জনসাধারণের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। ভূমিকম্পের অব্যবহিত পরেই আমরা প্রায় চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা ধরে সম্পূর্ণ মেট্রোরেল ব্যবস্থার প্রতিটি কাঠামো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা করেছি। আমিও সশরীরে সেই তদারকি প্রক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলাম।”
এমডি আরও উল্লেখ করেন, এই ধরনের পরিস্থিতিতে যাত্রী পরিষেবা পুনরায় শুরু করার আগে সাধারণত একটি ‘টেস্ট রান’ বা পরীক্ষামূলক ট্রেন চালানো হয়। কিন্তু নিরাপত্তার বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করতে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ সেদিন ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ নেয়। তিনি জানান: “ওই দিন আমরা কেবল একটি নয়, বরং দুটি ট্রেনকে উভয় দিক থেকে সম্পূর্ণ ট্র্যাকে পরীক্ষামূলকভাবে চালিয়েছি।”
এছাড়াও, মেট্রোরেলের কাঠামোগত স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে ফার্মগেট এবং বিজয় সরণি অঞ্চলের এলিভেটেড ভায়াডাক্টের বিয়ারিং প্যাডগুলি (যা কাঠামোগত ভার বহন করে) কর্মীরা হাতে-কলমে এবং শারীরিকভাবে পরীক্ষা করেন। এই পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার কারণে সেদিন নিয়মিত ট্রেন পরিষেবা শুরু করতে প্রায় ২৭ মিনিট অতিরিক্ত সময় লাগে। তবে কর্তৃপক্ষের মতে, যাত্রীদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এই বিলম্ব ছিল অপরিহার্য।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভূমিকম্প পরবর্তী সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন গুজব ও ভুল তথ্যের বিষয়েও আলোকপাত করেন।
তিনি স্বীকার করেন, “ভূমিকম্পের পরে আমরা সামাজিক মাধ্যমে অনেক কিছু দেখেছি। মেট্রোরেল ভেঙে পড়েছে—এমন খবরও ছড়িয়ে পড়তে দেখেছি। কিন্তু এই ধরনের ছবি বা তথ্য যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি করা হয়েছে, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে আমাদের কিছুটা সময় প্রয়োজন ছিল।”
সকল যাচাই-বাছাই শেষে ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে যে, মেট্রোরেলের মূল অবকাঠামোতে কোনো প্রকার ভৌত সরণ বা গুরুতর কাঠামোগত ক্ষতি হয়নি। মো. ফারুক আহমেদ বলেন, বাস্তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল খুবই সামান্য এবং তা মেট্রোরেলের অপারেশনাল স্থিতিশীলতার জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি করেনি।
তিনি ক্ষুদ্র ক্ষয়ক্ষতির তালিকা প্রদান করে জানান: একটি নির্দিষ্ট দেয়ালে সামান্য একটি ফাটল দেখা দিয়েছে। দুটি স্থানে টাইলস খসে পড়েছে। সিলিং থেকে দুটি সিলিং প্যাড খুলেছে।
ক্ষতিগুলো ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি সাধারণ একটি উদাহরণ ব্যবহার করেন: “ভূমিকম্পে আমার নিজের বাসার দেয়ালেও ফাটল দেখা দিয়েছে। এখন এই দেয়াল কেন ফাটল, সেটা তো আমি বলতে পারব না। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ধরনের ছোটখাটো ক্ষতি মেট্রোরেলের মূল কাঠামোর স্থায়িত্ব বা কার্যকারিতা ব্যাহত করেনি।”
এই সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ডিএমটিসিএল স্পষ্ট বার্তা দিল যে, দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন ব্যবস্থা ভূমিকম্প-সহনশীলতা মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছে এবং সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে এর কোনো মৌলিক ক্ষতি হয়নি। কর্তৃপক্ষ দৃঢ়ভাবে দাবি করে যে, ঢাকা মেট্রোরেল যাত্রীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ এবং সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে এর পরিষেবা প্রদান অব্যাহত থাকবে। এই বিবৃতি জনগণের মাঝে তৈরি হওয়া আতঙ্ক কমাতে এবং দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থার উপর আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডিএমটিসিএল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা ভবিষ্যতে এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় তাদের প্রোটোকলকে আরও উন্নত করতে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করছে। পাশাপাশি, প্ল্যাটফর্ম এবং স্টেশনগুলোর নন-স্ট্রাকচারাল উপাদান, যেমন টাইলস ও সিলিং প্যাড, যাতে শক্তিশালী কম্পনের সময়েও আরও সুরক্ষিত থাকে, সেই বিষয়েও পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এই পদক্ষেপগুলো আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার পরিচালনায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সতর্কতার মান বজায় রাখার ডিএমটিসিএল-এর অঙ্গীকারকে তুলে ধরছে।

