রাজধানীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া সরু অলিগলিগুলোতে এখন ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে নামসর্বস্ব শত শত প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আবাসিক ভবনের নিচতলা, অন্ধকারাচ্ছন্ন ফ্ল্যাট কিংবা অস্থায়ী কিছু খুপরি ঘরেই চলছে এসব ‘স্কুল’। কোনোটির নাম কেজি স্কুল, কোনোটি ইংলিশ মিডিয়াম আবার কোনোটি নামকাওয়াস্তে মাদ্রাসা।
বাহারি সাইনবোর্ডে আকৃষ্ট হয়ে অভিভাবকরা সন্তানদের ভর্তি করালেও, এসব প্রতিষ্ঠানের অন্দরে যে শিক্ষার ন্যূনতম পরিবেশ নেই—তা অনেকটা ‘ওপেন সিক্রেট’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিকাংশ স্কুলেই নেই প্রশস্ত ক্লাসরুম, নেই শিশুদের খেলার জায়গা, এমনকি জীবন রক্ষার প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থাও এখানে অনুপস্থিত।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদান পদ্ধতি কিংবা শিশুদের সুরক্ষায় সরকারের কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কারা এই স্কুলগুলো খুলছে, শিক্ষক হিসেবে কাদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে কিংবা সেখানে আদতে কী পড়ানো হচ্ছে—তার কোনো সুস্পষ্ট হিসাব নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে। একটি দীর্ঘস্থায়ী নীতিমালার অভাবে ঢাকার অলিগলির এই স্কুলগুলো এখন শিশুদের জন্য অনিরাপদ এক ‘আইনি ধূসর অঞ্চলে’ পরিণত হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত ‘শারমিন একাডেমি’র একটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে টনক নড়ে সাধারণ মানুষের। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, ৪ বছর বয়সী এক শিশুকে স্কুলের অফিস কক্ষের ভেতরে নির্মমভাবে প্রহার করছেন প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক পবিত্র কুমার। পাশেই শিশুটির হাত চেপে ধরে ছিলেন প্রধান শিক্ষিকা শারমিন আক্তার। সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়া সেই বর্বরতা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়, যার তিনদিন পর পুলিশ পবিত্র কুমারকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনার পর গত ২২ জানুয়ারি নয়াপল্টনের সেই স্কুল প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। প্রতিষ্ঠানের গেটে ঝুলছে বড় তালা, কর্তৃপক্ষ লাপাত্তা। স্কুলের কেয়ারটেকার কামরুল হক জানান, ঘটনার পর থেকে কাউকেই আর স্কুলে আসতে দেখা যায়নি। স্কুলের দেয়ালে থাকা যোগাযোগের নম্বরগুলোতে কল দিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, একটি ভবনের ঘিঞ্জি পরিবেশে বিউটি পার্লারের পাশেই চলছিল এই স্কুলটি। অথচ সেখানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কেউ ছিল না।
বাংলাদেশে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি ২০১১ সালেই হাইকোর্ট কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছে। ২০১৩ সালের শিশু আইন অনুযায়ী, শিশুকে নির্যাতন একটি দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ। তা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন সামান্যই। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২১ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নির্যাতনের ২১টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা ৩০-এ থাকলেও, ২০২৫ সালে তা এক লাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৯-এ। গত পাঁচ বছরের মধ্যে যা সর্বোচ্চ। এই পরিসংখ্যান কেবল নথিভুক্ত ঘটনার; বাস্তবের চিত্র সম্ভবত আরও ভয়াবহ।
অভিভাবকদের মধ্যে এখন চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে। মিরপুরের বাসিন্দা নাঈমা মিতু যেমনটা বলছিলেন, “চাকরির প্রয়োজনে সন্তানকে কাছের কোনো স্কুলে ভর্তি করা ছাড়া উপায় থাকে না। কিন্তু স্কুলের দেয়ালের ওপারে আমার বাচ্চার সাথে কী হচ্ছে, তা জানার কোনো উপায় নেই।
শারমিন একাডেমির ভিডিও দেখার পর থেকে রাতে ঘুমাতে পারছি না।” মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জন্য সরকারি লটারি ব্যবস্থায় জায়গা না পাওয়া শিশুদের জন্য এসব ছোট স্কুলই একমাত্র ভরসা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা প্রকারান্তরে তাদের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মনে করেন, রাষ্ট্রের উদাসীনতাই এই সংকটের মূলে। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হলেও আমরা একটি সুপরিকল্পিত ও সমন্বিত শিক্ষা কাঠামো গড়তে পারিনি। কোথায় কতগুলো স্কুল প্রয়োজন তার কোনো ম্যাপ আমাদের কাছে নেই। এই শূন্যতার সুযোগেই একশ্রেণির মানুষ শিক্ষাকে নিছক ব্যবসায় পরিণত করেছে।”
অধ্যাপক জিন্নাহ আরও যোগ করেন, কিন্ডারগার্টেন ও ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর অনেকগুলোই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং সোসাইটি বা ট্রাস্ট হিসেবে নিবন্ধিত। ফলে শিক্ষক নিয়োগে তাদের কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না। তিনি বলেন, “শিশুদের লালন-পালন ও শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতির প্রয়োজন, তা এই অদক্ষ শিক্ষকদের নেই। শিশুদের যত্ন নিতে দক্ষ ‘মালি’ দরকার, অথচ আমরা তাদের অদক্ষ হাতে সঁপে দিচ্ছি।”
এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করেছেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) আবু নূর মো. শামসুজ্জামান। তিনি বলেন, “কোনো শিশুকে শারীরিক বা মানসিকভাবে আঘাত করার অধিকার কারো নেই। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয় অপরাধ।”
বেসরকারি স্কুলগুলোর তদারকি প্রসঙ্গে তিনি জানান, ইতোমধ্যে একটি সংশোধিত বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে এবং নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে নতুন সফটওয়্যার চালু করা হচ্ছে। চলতি বছরেই সব বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কঠোর মানদণ্ড পূরণ করে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
তবে মাঠপর্যায়ে এই পরিকল্পনা কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। যতক্ষণ পর্যন্ত ঢাকার প্রতিটি অলিগলির স্কুল সরকারি কঠোর নজরদারির আওতায় না আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত শিশুদের শৈশব এবং তাদের নিরাপত্তা একটি অনিশ্চিত সুতোর ওপর ঝুলে থাকবে বলেই আশঙ্কা করা হচ্ছে।

