রাজধানীর কেন্দ্রস্থলে গত ৭ জানুয়ারি রাতে ঘটে যাওয়া চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে শুরু করেছে। জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান ওরফে মুছাব্বির খুনের ঘটনায় এবার সরাসরি যুক্ত থাকা আরও এক শুটারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি চৌকস দল নরসিংদীতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে রহিম নামের ওই সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করে। রহিম এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি গুলি চালিয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। গ্রেপ্তারের সময় তার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটিও উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে এই গ্রেপ্তারের খবর নিশ্চিত করেছেন। তবে অভিযানের স্পর্শকাতরতার কারণে রহিমের পূর্ণ পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেনি পুলিশ।
ডিবি প্রধান জানান, নরসিংদীতে চালানো এই অভিযানটি ছিল গোপন তথ্যের ভিত্তিতে করা একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ। রহিমকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে পুলিশ। তবে অভিযান এখনো শেষ হয়নি।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ডিবির একাধিক দল এখনো তল্লাশি চালাচ্ছে। এই ঘটনায় জড়িত অন্য সহযোগীদের অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে আগামীকাল এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানাবে ডিএমপি।
হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল চলতি মাসের ৭ জানুয়ারি রাত ৮টা ২০ মিনিটের দিকে। স্থানটি ছিল রাজধানীর অত্যন্ত জনাকীর্ণ পান্থপথ এলাকা। বসুন্ধরা সিটির ঠিক পেছনে অবস্থিত স্টার হোটেলের সামনে যখন মুছাব্বির দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা।
সেই রাতে গুলির শব্দে থমকে গিয়েছিল পুরো এলাকা। ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পড়েন ৪৪ বছর বয়সী মুছাব্বির। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনা তখন রাজনৈতিক অঙ্গনেও বেশ উত্তাপ ছড়িয়েছিল।
পরদিন ৮ জানুয়ারি নিহতের স্ত্রী সুরাইয়া আক্তার বাদী হয়ে তেজগাঁও থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এজাহারে তিনি কোনো নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ না করলেও অজ্ঞাতনামা চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করেছিলেন। ঘটনার পর থেকেই ডিবি পুলিশ ছায়া তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় ১০ জানুয়ারি প্রথম বড় ধরনের সফলতা পায় পুলিশ। মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন জিন্নাত (২৪), আব্দুল কাদির (২৮) ও মো. রিয়াজ (৩২)।
পুলিশের ভাষ্যমতে, ধৃত এই তিনজন হত্যাকাণ্ডের রেইকি এবং পালানোর পথে সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেছিল। তবে সরাসরি ট্রিগার চাপা শুটাররা তখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। রহিম গ্রেপ্তার হওয়ার মাধ্যমে মামলার তদন্তে এক বড় মোড় এলো।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, মুছাব্বিরকে হত্যার পেছনে কোনো রাজনৈতিক রেষারেষি নাকি ব্যক্তিগত শত্রুতা কাজ করেছে, তা নিবিড়ভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। উদ্ধারকৃত অস্ত্রটি ব্যালেস্টিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে বলেও জানা গেছে।
রাজধানীর পান্থপথের মতো সুরক্ষিত এলাকায় জনসমক্ষে এমন হত্যাকাণ্ড জনমনে এক ধরণের আতঙ্ক তৈরি করেছিল। বিশেষ করে স্বেচ্ছাসেবক দলের মতো একটি সংগঠনের নেতার ওপর হামলাকে অনেকেই গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছিলেন।
নিহত মুছাব্বিরের পরিবার শুরু থেকেই সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করে আসছে। আজ রহিমের গ্রেপ্তারের খবর পাওয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে দ্রুত বিচার কাজ শুরু করার দাবি জানানো হয়েছে। পরিবারের সদস্যরা চান, পর্দার আড়ালে থাকা মূল খুনিদের যেন আড়াল না করা হয়।
অন্যদিকে, ডিবি পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের জবানবন্দি থেকে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে যা এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ স্পষ্ট করছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই সবকিছু খোলাসা করতে চাইছে না পুলিশ প্রশাসন।
আগামীকালকের সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ নকশা বা ‘ক্রাইম ম্যাপ’ প্রকাশ করা হতে পারে। সেখানে জানা যাবে রহিম কার নির্দেশে এবং কত টাকার বিনিময়ে এই কাজ করেছিল, নাকি এর পেছনে বড় কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল।
বর্তমানে ডিবি কার্যালয়ে রহিমকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাকে নরসিংদী থেকে ঢাকায় আনার পর থেকেই দফায় দফায় জেরা করা হয়েছে। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় গোপন আস্তানায় অভিযান চালাচ্ছে ডিবির বিশেষ টিম।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে অস্ত্রধারী শুটারদের এমন অবাধ বিচরণ নিয়ে উদ্বেগের মুখে পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে। আজকের এই গ্রেপ্তার পুলিশের জন্য একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ খুনে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার হওয়া যে কোনো হত্যা মামলায় শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

