বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে কেনা হচ্ছে দুটি বিশালাকৃতির হাই স্পিড বোট। বুধবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়েছে।
বৈঠক শেষে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এই দুটি বিশেষায়িত বোট কেনার জন্য সরকারের মোট ব্যয় হবে ৮৯ কোটি ৫০ লাখ ১৯ হাজার ১৮৭ টাকা। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিউডিপি) এই বোট দুটি তৈরি করবে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান খুলনা শিপইয়ার্ড লিমিটেড। দেশীয় সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিয়ে এই দায়িত্ব শিপইয়ার্ডকে দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বুধবারের এই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমদ। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোস্টগার্ডের আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করা হয়। কমিটির সদস্যরা দীর্ঘ পর্যালোচনার পর এই ক্রয় প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। এর ফলে দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত ঘাটতি কাটিয়ে কোস্টগার্ডের টহল কার্যক্রম আরও বেগবান হবে।
সমুদ্রপথে মাদক চোরাচালান রোধ, মানবপাচার নিয়ন্ত্রণ এবং মৎস্য সম্পদ রক্ষায় কোস্টগার্ডের এই নতুন সংযোজন অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন নদ-নদীতে দ্রুতগামী জলযানগুলোর বিরুদ্ধে আভিযানিক সফলতার জন্য এ ধরনের হাই স্পিড বোটের প্রয়োজনীয়তা দীর্ঘদিনের। খুলনা শিপইয়ার্ডের কারিগরি দক্ষতায় নির্মিত এই বোটগুলো আন্তর্জাতিক মানের হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে একই বৈঠকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ কমিটি। চট্টগ্রামের মিরসরাই ও সন্দ্বীপসহ কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপ ও টেকনাফের সাবরাং ও জালিয়ার দ্বীপ অংশে জেটি ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণের একটি দরপত্র পর্যালোচনার পর তা বাতিল করা হয়। কারিগরি বা আর্থিক অসঙ্গতির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উপকূলীয় নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় উদ্ধার তৎপরতা চালাতেও এই হাই স্পিড বোটগুলো সহায়ক হবে। আধুনিক রাডার এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় সজ্জিত এই নৌযানগুলো প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে তৈরি করা হবে। সরাসরি দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে কেনার এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় শিল্পকেও এক ধরনের উৎসাহ যোগাবে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। গভীর সমুদ্রে টহল দেওয়ার সক্ষমতা বাড়লে বিদেশি মৎস্যজীবীদের অনুপ্রবেশ যেমন কমবে, তেমনি জাতীয় সার্বভৌমত্ব আরও সুরক্ষিত হবে। কোস্টগার্ডের জন্য এই বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার অংশ হিসেবেই দেখছে সরকার।
বৈঠক শেষে উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমদ সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রতিটি ক্রয় প্রস্তাব অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও সতর্কতার সাথে যাচাই করা হচ্ছে। দেশের সম্পদ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। খুলনা শিপইয়ার্ডের সাথে চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই এই বোট দুটি সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
এই প্রকল্পের মাধ্যমে কোস্টগার্ডের আধুনিকায়ন প্রক্রিয়ায় নতুন এক মাত্রা যোগ হলো। শুধু বোট কেনাই নয়, সামনের দিনগুলোতে এই বাহিনীর জন্য আরও আধুনিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এর ফলে উপকূলের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও আস্থার প্রতীক হিসেবে কোস্টগার্ড আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।

