বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ ইমাম, মুয়াজ্জিন ও মসজিদ সংশ্লিষ্ট জনবলের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। দেশের মসজিদগুলোতে কর্মরত খতিব, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বেতন কাঠামো এবং আবাসন সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ ‘মসজিদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৫’ গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে সরকার।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বাংলাদেশ গেজেটের অতিরিক্ত সংখ্যায় এটি প্রকাশিত হয়। এই নীতিমালার মাধ্যমে মসজিদের জনবলকে জাতীয় বেতন স্কেলের আওতায় আনা হয়েছে, যা দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ধর্ম উপদেষ্টা ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের সক্রিয় তত্ত্বাবধানে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-ওলামাদের মতামতের ভিত্তিতে এই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, মসজিদের খতিবদের বেতন নির্ধারিত হবে উভয় পক্ষের চুক্তিপত্রের শর্তানুসারে। তবে অন্যান্য পদের জন্য জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট গ্রেড নির্ধারণ করা হয়েছে:
সিনিয়র পেশ ইমাম: জাতীয় বেতন স্কেলের ৫ম গ্রেড। পেশ ইমাম: ৬ষ্ঠ গ্রেড। ইমাম: ৯ম গ্রেড। প্রধান মুয়াজ্জিন: ১০ম গ্রেড। মুয়াজ্জিন: ১১তম গ্রেড। প্রধান খাদিম: ১৫তম গ্রেড এবং খাদিম: ১৬তম গ্রেড।
তবে নীতিমালায় এটিও স্পষ্ট করা হয়েছে যে, আর্থিকভাবে অসচ্ছল এবং ছোট ‘পাঞ্জেগানা’ মসজিদের ক্ষেত্রে কমিটির সামর্থ্য অনুযায়ী বেতন-ভাতাদি সমন্বয় করা যাবে।
ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সামাজিক মর্যাদা ও পারিবারিক স্বস্তির কথা বিবেচনা করে এই নীতিমালায় সপরিবারে আবাসনের বিধান রাখা হয়েছে। মসজিদ কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা সামর্থ্য অনুযায়ী মসজিদের জনবলের জন্য মানসম্মত আবাসন নিশ্চিত করেন।
এছাড়া, কর্মকাল শেষে যেন তাঁরা শূন্য হাতে বাড়ি না ফেরেন, সেজন্য মাসিক সঞ্চয়ের বাধ্যতামূলক বিধান রাখা হয়েছে। চাকরির মেয়াদ শেষ হলে এককালীন সম্মাননা প্রদানের নির্দেশনাও গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আগের নীতিমালাগুলোতে ইমামদের ছুটির বিষয়টি ছিল অনেকটা অনিশ্চিত। নতুন নীতিমালায় তা সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। এখন থেকে মসজিদের জনবল মাসে সর্বোচ্চ চার দিন সাপ্তাহিক ছুটি ভোগ করতে পারবেন। এছাড়া বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি এবং প্রতি ১২ দিনের কাজের বিপরীতে এক দিন করে অর্জিত ছুটির সুযোগ পাবেন তাঁরা।
নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে সাত সদস্যের একটি শক্তিশালী বাছাই কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। কমিটির সুপারিশ ছাড়া এখন থেকে সরাসরি কাউকে নিয়োগ দেওয়া যাবে না এবং প্রত্যেককে নিয়োগপত্র প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
আধুনিক প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় এবার মসজিদে ‘নিরাপত্তা প্রহরী’ ও ‘পরিচ্ছন্নতাকর্মী’ নামে দুটি নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। পাশাপাশি, নারীদের জন্য মসজিদে শরীয়তসম্মত পৃথক নামাজের স্থান রাখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মসজিদ ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫ জন করা হয়েছে, তবে মসজিদের আকার অনুযায়ী এটি কম-বেশি হতে পারে।
এই নীতিমালা বাস্তবায়নে কোনো স্থানীয় জটিলতা দেখা দিলে তা নিরসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিটিকে। ২০০৬ সালের পুরনো নীতিমালাটি বাতিল করে এই নতুন নিয়ম অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

