২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে ইন্টারনেট সেবা বিচ্ছিন্ন করে পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ চালানোর দায়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় অভিযুক্তদের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে বুধবার (২১ জানুয়ারি) অভিযোগ গঠন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এদিন এই আদেশ দেন। মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য এবং সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছে। এর মাধ্যমে জুলাই গণহত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধরনের আইনি অগ্রগতি সাধিত হলো।
বুধবার সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে কেরানীগঞ্জ কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। অন্যদিকে, পলাতক আসামি সজীব ওয়াজেদ জয়ের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী মনজুর আলম শুনানিতে অংশ নেন। আসামিপক্ষ তাদের মক্কেলদের নির্দোষ দাবি করে মামলা থেকে অব্যাহতির আবেদন জানালেও আদালত তা নাকচ করে দেন।
ট্রাইব্যুনালের সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ আসামিদের বিরুদ্ধে আনা তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পড়ে শোনান। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংগঠনে এই দুই ব্যক্তি প্রত্যক্ষভাবে প্ররোচনা ও সহায়তা জুগিয়েছেন।
আদালতে পেশ করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের (ফরমাল চার্জ) প্রধান দিক ছিল ইন্টারনেটের ব্ল্যাকআউট বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা। প্রসিকিউশনের দাবি, সজীব ওয়াজেদ জয়ের নির্দেশে এবং জুনাইদ আহমেদ পলকের সক্রিয় তদারকিতে দেশে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করা হয়েছিল, যাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র ক্যাডারদের চালানো হত্যাযজ্ঞের তথ্য বিশ্ববাসীকে জানানো না যায়।
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই রাতে ফেসবুকে উস্কানিমূলক পোস্ট দেন পলক। এর পরদিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ ও ছাত্রলীগ মারণাস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অভিযোগ নম্বর দুই অনুযায়ী, রাসেল ও মোসলেহ উদ্দিনসহ অন্তত ২৮ জন নিহতের ঘটনায় এই দুই আসামির প্রত্যক্ষ উস্কানি ছিল।
ট্রাইব্যুনালে দাখিল করা তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজধানীর উত্তরায় ৩৪ জন আন্দোলনকারীকে হত্যার ঘটনায় আসামিরা সহায়তা করেছেন। তদন্তকারী সংস্থার মতে, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও সাইবার স্পেস ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের অবস্থান শনাক্ত করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশনায় জয়ের ভূমিকা ছিল নীতিনির্ধারক পর্যায়ের।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, “এটি কেবল সাধারণ কোনো হত্যাকাণ্ড নয়, বরং একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর চালানো মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। আধুনিক প্রযুক্তিকে যারা মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়ার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিল, আজ তাদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে।”
সজীব ওয়াজেদ জয় দেশের বাইরে অবস্থান করায় এর আগে ১০ ডিসেম্বর তাকে আত্মসমর্পণের জন্য দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হাজির না হওয়ায় তার অনুপস্থিতিতেই বিচার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। জয়ের পক্ষে আইনি লড়াই করার জন্য রাষ্ট্র একজন আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিধি অনুযায়ী নিশ্চিত করা হয়েছে।
এদিকে, পলকের আইনজীবীরা শুনানিতে দাবি করেন, আইসিটি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি কেবল উচ্চপর্যায়ের সরকারি আদেশ পালন করেছেন এবং ব্যক্তিগতভাবে কোনো হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তবে প্রসিকিউশন এই যুক্তি খণ্ডন করে বলে, পলকের সরাসরি তদারকিতেই সারাদেশে ‘ডিজিটাল ক্র্যাকডাউন’ চালানো হয়েছিল।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় শহীদ হওয়া পরিবারের সদস্যরা ট্রাইব্যুনালের এই আদেশে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। শহীদ রাসেলের এক স্বজন আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, “ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে আমাদের সন্তানদের পশুর মতো মারা হয়েছিল। আমরা শুধু এই অন্যায়ের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।”
১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া সাক্ষ্যগ্রহণ পর্বে আন্দোলনের সময় আহত ও প্রত্যক্ষদর্শীরা তাদের জবানবন্দি পেশ করবেন। এই বিচার প্রক্রিয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

