জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তঝরা দিনগুলোতে রাজধানীর চানখারপুলে সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নতুন মোড় এসেছে। বহুল প্রতীক্ষিত ছয় হত্যা মামলার রায় আজ ঘোষণা করার কথা থাকলেও তা পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আগামী ২৬ জানুয়ারি নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
মঙ্গলবার সকালে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলোর উৎকণ্ঠার মধ্যেই এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ জানান, রায়ের অনুলিপি পূর্ণাঙ্গভাবে প্রস্তুত না হওয়ায় এই বিলম্ব।
গত ২৪ ডিসেম্বর আদালত আজকের দিনটিকে (২০ জানুয়ারি) রায় ঘোষণার জন্য ক্যালেন্ডারভুক্ত করেছিলেন। তবে বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীসহ পুরো বেঞ্চ বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য আরও কয়েক দিন সময় নিয়েছেন।
আদালত প্রাঙ্গণে আজ সকালেই উপস্থিত হয়েছিলেন শহীদদের স্বজনরা। তাদের চোখেমুখে ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার ছাপ। জুলাই আন্দোলনের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যারা রাজপথে প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের রক্তের ঋণ শোধের আশায় তারা গত কয়েক মাস ধরে আদালতের বারান্দায় ঘুরছেন।
এই মামলার কেন্দ্রে রয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখারপুল এলাকায় শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলে পুলিশের বেপরোয়া গুলি। সেদিন শাহরিয়ার খান আনাস, শেখ জুনায়েদ, মো. ইয়াকুব, মো. রাকিব হাওলাদার, মো. ইসমামুল হক ও মানিক মিয়া শাহরিক পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, এই মামলায় মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে তৎকালীন পুলিশ প্রশাসনের প্রভাবশালী চার কর্মকর্তা বর্তমানে পলাতক। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান এবং সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী।
গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা চার আসামিকে আজ কড়া নিরাপত্তায় ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন শাহবাগ থানার সাবেক পরিদর্শক (অপারেশন) মো. আরশাদ হোসেন এবং তিন কনস্টেবল—সুজন মিয়া, ইমাজ হোসেন ইমন ও নাসিরুল ইসলাম।
মামলার বিচারিক কার্যক্রম ছিল বেশ দ্রুতগতির। মাত্র ২৩ কার্যদিবসে ২৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করেছে ট্রাইব্যুনাল। সাক্ষীদের তালিকায় ছিলেন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা ও আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছিলেন।
সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদ আনাসের বাবা শাহরিয়ার খান পলাশ এবং মা সানজিদা খান দীপ্তি। তারা আদালতকে জানিয়েছেন, সেদিন কীভাবে নিরস্ত্র কিশোর-তরুণদের ওপর গুলি চালানো হয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শী ও অন্যান্য শহীদ পরিবারের সদস্যরাও কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে ঘটনার বর্ণনা দেন।
তদন্ত কর্মকর্তাদের সাক্ষ্যে উঠে এসেছে কীভাবে কমান্ড চেইন অনুসরণ করে বা ক্ষেত্রবিশেষে আইন লঙ্ঘন করে নিরস্ত্র মানুষের ওপর মরণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল। প্রসিকিউশন তাদের সমাপনী যুক্তিতর্কে সব আসামির জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি অর্থাৎ মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে।
অন্যদিকে, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, পুলিশ কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছিল এবং প্রসিকিউশনের আনা অভিযোগগুলো তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। তারা গ্রেপ্তার চার আসামির খালাস চেয়েছেন।
পলাতক চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে আদালত সূত্র জানিয়েছে, পলাতক থাকা আসামিদের অনুপস্থিতিতেই বিচারকাজ আইনানুগভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ২৬ জানুয়ারি নির্ধারিত দিনে রায় হলে এটিই হবে জুলাই অভ্যুত্থান কেন্দ্রিক মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম পূর্ণাঙ্গ রায়।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই রায় কেবল ছয়টি পরিবারের বিচার প্রাপ্তি নয়, বরং জুলাই-আগস্টের পুরো গণআন্দোলনে হওয়া দমন-পীড়নের বিচার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। বিচার বিলম্বিত হওয়ায় কিছুটা নিরাশ হলেও ন্যায়বিচারের আশায় বুক বেঁধেছেন শহীদদের স্বজনরা।
আদালত থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় এক শহীদের বাবা আক্ষেপ করে বলেন, “আমরা তো জীবন ফিরে পাব না, শুধু চাই যেন খুনিদের সাজা হয়। আর কোনো বাবা যেন এভাবে তার সন্তানকে না হারায়।” এখন সবার নজর আগামী সোমবারের দিকে, যেদিন নির্ধারিত হবে এই চাঞ্চল্যকর মামলার আইনি পরিণতি।

