আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় তৈরির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। নির্বাচনের দিন আকাশপথে ড্রোনের কড়া নজরদারি আর মাটিতে দক্ষ ডগ স্কোয়াডের উপস্থিতিতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আজ সচিবালয়ে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর এই প্রস্তুতির কথা সংবাদমাধ্যমকে জানান।
এবারের নির্বাচনে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে মোট ৪১৮টি ড্রোন মোতায়েন করা হবে। এর মধ্যে সেনাবাহিনী একাই পরিচালনা করবে ২০০টি ড্রোন। এছাড়াও বিজিবি ১০০টি, পুলিশ ৫০টি এবং র্যাব ও কোস্টগার্ডসহ অন্যান্য বাহিনীগুলো বাকি ড্রোনগুলো দিয়ে ভোটকেন্দ্র ও আশপাশের এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাবে। আকাশপথে এই আধুনিক টহল নির্বাচনী সহিংসতা রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ড্রোনের পাশাপাশি বিশেষায়িত ডগ স্কোয়াডও নিয়োজিত থাকবে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল ভোটকেন্দ্রগুলোতে বিস্ফোরক বা কোনো সন্দেহভাজন বস্তুর উপস্থিতি শনাক্ত করতে এই বাহিনী কাজ করবে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, দেশের প্রায় নয় লাখ (৮ লক্ষ ৯৭ হাজার ১১৭ জন) আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এই নির্বাচনে দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে পাঁচ লাখের বেশি আনসার ও ভিডিপি সদস্য এবং এক লাখ সেনা সদস্য মাঠে থাকবেন।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে দুই ধাপে। প্রথম ধাপের মোতায়েন কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৮ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট সাত দিন ভোটকেন্দ্রভিত্তিক বিশেষ মোতায়েন থাকবে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনে ভোটারদের সুরক্ষা এবং ভোটকেন্দ্রের পবিত্রতা রক্ষায় মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স রিটার্নিং কর্মকর্তাদের অধীনে কাজ করবে।
নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা আনতে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ৮ হাজার ৭৮০টি কেন্দ্রে ২৫ হাজার বডি-ওর্ন (Body-worn) ক্যামেরা ব্যবহার করবে পুলিশ। এছাড়া প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। প্রযুক্তির এই বিশাল সমন্বয়ের মূল লক্ষ্য হলো—নির্বাচনে কোনো ধরনের পেশিশক্তি বা অন্যায়ের সুযোগ না রাখা।
এবারের নির্বাচনের অন্যতম আকর্ষণ হতে যাচ্ছে ‘নির্বাচন সুরক্ষা অ্যাপ-২০২৬’। ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এই অ্যাপটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করবে। কোনো কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে এই অ্যাপের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানানো যাবে এবং অতি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হবে।
নির্বাচনকালীন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিম সরাসরি নির্বাচন সংক্রান্ত অভিযোগগুলো এলাকাভিত্তিক নিরাপত্তা সেলে পাঠিয়ে দিবে। এছাড়া ২০ জানুয়ারির মধ্যে সকল বাহিনীর নির্বাচনী প্রশিক্ষণ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমবারের মতো নির্বাচনের জন্য বাহিনীর সদস্যদের এমন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সারাদেশে মোট ৪২ হাজার ৭৬১টি ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৫৪৮টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা আশ্বস্ত করে বলেন, কোনো গোষ্ঠী বা মহল যাতে নির্বাচনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করতে না পারে, সেজন্য সেনাবাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীকে ‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’-এর আওতায় বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
ভোটের আগের দিনগুলোতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের গ্রেফতারে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করারও ইঙ্গিত দিয়েছেন উপদেষ্টা। বিভিন্ন এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হবে। সব মিলিয়ে একটি উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকার বদ্ধপরিকর।

