রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশন ভবনের অডিটোরিয়াম আজ এক ভিন্নধর্মী আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের সাক্ষী হলো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আপিল শুনানির শেষ দিনে টাঙ্গাইল-৪ আসনের হেভিওয়েট প্রার্থী আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর প্রার্থিতা নিয়ে ওঠা এক জটিল প্রশ্নের মুখে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুল রহমানেল মাছউদ এমন এক মন্তব্য করেছেন, যা দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
শুনানি চলাকালে লতিফ সিদ্দিকীর প্রার্থিতা বাতিলের দাবিতে যুক্তি উপস্থাপন করছিলেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী লিয়াকত আলীর আইনজীবী। এক পর্যায়ে জ্যেষ্ঠ কমিশনার মাছউদ তাকে থামিয়ে দিয়ে সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেন, “সরকার একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেছে ঠিকই, কিন্তু কোনো ব্যক্তিকে তো নিষিদ্ধ করেনি।” কমিশনারের এই ছোট কিন্তু গভীর অর্থবহ মন্তব্যটি মুহূর্তেই অডিটোরিয়ামে উপস্থিত সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয়।
ঘটনার সূত্রপাত টাঙ্গাইল-৪ আসনের মনোনয়নকে কেন্দ্র করে। সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন প্রবীণ রাজনীতিক আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। তার এই মনোনয়নের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছিলেন ওই আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. লিয়াকত আলী। তার আইনজীবীর মূল যুক্তি ছিল, লতিফ সিদ্দিকী একটি নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, ফলে তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার নৈতিক বা আইনি যোগ্যতা হারিয়েছেন।
তবে নির্বাচন কমিশনার আব্দুল রহমানেল মাছউদ এই যুক্তির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি পরিষ্কার করে দেন যে, দলগত আদর্শ বা সাংগঠনিক কারণে কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হলেও, সেই সংগঠনের সদস্যদের ব্যক্তিগত নাগরিক অধিকার বা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সাংবিধানিক অধিকার তাতে ক্ষুণ্ণ হয় না। দীর্ঘ শুনানির পর কমিশন লতিফ সিদ্দিকীর মনোনয়ন বৈধ বলে রায় দেয়। এর ফলে আসন্ন নির্বাচনে তার ভোট যুদ্ধে নামার পথে আর কোনো আইনি বাধা রইল না।
আজ সকাল সোয়া ১০টা থেকে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের বেজমেন্ট-২ অডিটোরিয়ামে এই শুনানি শুরু হয়। এটি ছিল আপিল নিষ্পত্তির নির্ধারিত সময়ের শেষ দিন। ফলে প্রাঙ্গণ জুড়ে ছিল উপচে পড়া ভিড় এবং টানটান উত্তেজনা। একদিকে যেমন লতিফ সিদ্দিকীর প্রার্থিতা বৈধ হওয়ার খবর আসছিল, অন্যদিকে নির্বাচন ভবনের বাইরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিক্ষোভ এবং তারেক রহমানের নির্বাচনমুখী হওয়া নিয়ে রাজনৈতিক উত্তাপ ছিল তুঙ্গে।
লতিফ সিদ্দিকীর প্রার্থিতা টিকে যাওয়াকে অনেকেই রাজনীতির মাঠে তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার বিজয় হিসেবে দেখছেন। তবে এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, নিষিদ্ধ দলের নেতাদের ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে সুযোগ দেওয়া হলে আইনি প্রক্রিয়ার লক্ষ্য কতটুকু পূরণ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অন্যদিকে আইনজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিগত দায় আর দলীয় দায় আলাদা করা বিচারিক কাঠামোর একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ।
নির্বাচন কমিশনের সংশোধিত তফসিল অনুযায়ী, আজ ১৮ জানুয়ারি ছিল আপিল নিষ্পত্তির শেষ দিন। অর্থাৎ চূড়ান্ত লড়াইয়ে কারা থাকছেন, সেই চিত্র এখন অনেকটা পরিষ্কার। তবে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সুযোগ থাকছে। যারা শেষ পর্যন্ত মাঠে টিকে থাকবেন, তারা ২১ জানুয়ারি হাতে পাবেন নির্বাচনী প্রতীক। আর প্রতীক হাতে পাওয়া মাত্রই শুরু হবে উৎসবের আমেজ আর ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাওয়ার পালা।
প্রজাতন্ত্রের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের চূড়ান্ত ক্ষণ নির্ধারিত হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬। ওই দিন বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত একটানা ভোট গ্রহণ চলবে। ভোটাররা তাদের আগামী দিনের প্রতিনিধি বেছে নেবেন। তবে ভোটের মূল প্রচার শুরু হবে ২২ জানুয়ারি থেকে, যা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল পর্যন্ত।
টাঙ্গাইল-৪ আসনে আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীর মতো প্রবীণ নেতার অবস্থান লিয়াকত আলীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লতিফ সিদ্দিকীর প্রার্থিতা বৈধ হওয়াতে ওই আসনের নির্বাচনী সমীকরণ অনেকটাই পাল্টে গেল। ভোটারদের মনে এখন প্রশ্ন, আইনি লড়াইয়ে এই জয় ভোটের বাক্সে কতটা প্রভাব ফেলবে?
নির্বাচন কমিশনের আজকের এই পর্যবেক্ষণ কেবল লতিফ সিদ্দিকীর জন্যই নয়, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়া যে কোনো প্রার্থীর জন্য একটি আইনি ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। কমিশনার মাছউদের এই মন্তব্যে এটি স্পষ্ট যে, নির্বাচন কমিশন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অধিকার এবং দলীয় নিষেধাজ্ঞার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম বিভাজন রেখা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।
দিনভর চলা এই রুদ্ধশ্বাস শুনানি শেষে বিকেলে যখন আদেশের কপিগুলো বের হচ্ছিল, তখন অনেক প্রার্থীর সমর্থকের চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছাপ। তবে লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়টি ছিল টক অব দ্য টাউন। এখন সবার নজর প্রতীক বরাদ্দের দিনের দিকে। সেদিনই চূড়ান্ত হবে, টাঙ্গাইলের এই প্রবীণ সিংহ কোন প্রতীক নিয়ে লড়াইয়ে নামছেন।

