বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক চাঞ্চল্যকর অধ্যায়ের সূচনা করে, শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে এই ঐতিহাসিক আদেশ প্রদান করেন। ট্রাইব্যুনালের এই আদেশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচারিক কার্যক্রমের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হলো।
এদিন সকাল থেকেই আদালত চত্বরে ছিল কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কড়া পুলিশি পাহারায় প্রিজনভ্যানে করে সাবেক এই প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। বিচারিক প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
শুনানির শুরুতে বিবাদী পক্ষের আইনজীবীরা জিয়াউল আহসানকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আবেদন জানালে আদালত তা সরাসরি খারিজ করে দেন। এরপর বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ আসামির বিরুদ্ধে আনীত তিনটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পড়ে শোনান। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো অবস্থায় জিয়াউল আহসানের কাছে জানতে চাওয়া হয় তিনি দোষী কি না; উত্তরে তিনি সংক্ষিপ্তভাবে নিজেকে ‘নির্দোষ’ দাবি করেন।
আদালতের নথিপত্র এবং প্রসিকিউশনের দাখিলকৃত তথ্য অনুযায়ী, জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর ও সুনির্দিষ্ট। প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে তিনটি পৃথক অভিযোগে মোট ১০৩ জন ব্যক্তিকে হত্যার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ১১ জুলাই রাতে গাজীপুর সদর থানার পুবাইল এলাকায় জিয়াউল আহসানের সরাসরি উপস্থিতিতে সজলসহ তিনজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার বলেশ্বর নদীর মোহনায় নজরুল ও মল্লিকসহ অন্তত ৫০ জনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। তৃতীয় অভিযোগে একইভাবে আরও ৫০ জন ব্যক্তিকে হত্যার দায় চাপানো হয়েছে আসামির ওপর। প্রসিকিউশনের দাবি, একই সময়কালে বরগুনার বলেশ্বর নদী ও বাগেরহাটের শরণখোলা সংলগ্ন সুন্দরবন এলাকায় তথাকথিত ‘বনদস্যু দমন’ অভিযানের নামে মাসুদসহ আরও অর্ধশত সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম এবং প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম ও শাইখ মাহদী। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনি লড়াই পরিচালনা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী এবং নাজনীন নাহার। গত ৪ জানুয়ারি প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে আনুষ্ঠানিক চার্জ বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে, সংগৃহীত তথ্য-প্রমাণ ও সাক্ষ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এসব হত্যাকাণ্ড ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার নেপথ্যে আসামির সরাসরি সংশ্লিষ্টতা ও নির্দেশ ছিল। যদিও আসামিপক্ষ গত ৮ জানুয়ারি এসব অভিযোগের বিরোধিতা করে দাবি করেছিল যে, রাষ্ট্রপক্ষের তথ্য-উপাত্তের সঙ্গে তাদের মক্কেলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
গত ১৭ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের আনা তিনটি অভিযোগ আমলে নিয়েছিলেন এবং ২৩ ডিসেম্বর তাকে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। দীর্ঘ তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পন্ন হওয়ার পর আজ থেকে মামলাটি সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে উন্নীত হলো। আদালত আগামী ৮ ফেব্রুয়ারি মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন এবং প্রথম পর্যায়ের সাক্ষ্যগ্রহণের দিন নির্ধারণ করেছেন।
মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পদে আসীন থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে এসব অপরাধ সংঘটিত করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দীর্ঘকাল ধরে এসব গুম ও খুনের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানানো হচ্ছিল।
আজকের এই অভিযোগ গঠনের আদেশের মাধ্যমে ন্যায়বিচারের পথ সুগম হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের প্রচলিত আইন এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এই বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে বলে আদালত আশ্বস্ত করেছেন।
আগামী ৮ ফেব্রুয়ারির শুনানিকে কেন্দ্র করে এখন বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ জনগণের দৃষ্টি আদালতের দিকে নিবদ্ধ। এই বিচারের মাধ্যমে বছরের পর বছর নিখোঁজ থাকা ও নিহত হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলো অবশেষে সত্য ও ন্যায়বিচারের দেখা পাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

