বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্রে কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট নাগরিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা: গণতান্ত্রিক শাসনের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক নীতি সংলাপে বক্তারা এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তাদের মতে, নাগরিক নিরাপত্তার প্রশ্নে মানুষের আস্থা নষ্ট হলে রাষ্ট্র শক্তিশালী হওয়ার বদলে দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে সিজিএস সভাপতি জিল্লুর রহমান বলেন, গণতন্ত্র ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংস্কার কমিশন গঠন না হওয়া একটি বড় ঘাটতি।
সংলাপে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. এম. এনামুল হক বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রোহিঙ্গা সংকট ভবিষ্যতে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাতীয় স্বার্থকে সবার উপরে রাখার মানসিকতা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে। এছাড়া পুলিশের এফআইআর সংক্রান্ত বিদ্যমান বিতর্কিত চর্চাগুলো বন্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, বিচার ব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং পরিবহন খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত করা না গেলে জাতীয় নিরাপত্তা কখনোই সুসংহত হবে না।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, নিরাপত্তার প্রচলিত সংজ্ঞা বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় আর কার্যকর নয়। বর্তমানে নিরাপত্তা অত্যন্ত বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ। তিনি ভেনেজুয়েলা, পানামা ও চিলির রাজনৈতিক পরিস্থিতির উদাহরণ টেনে বলেন, অভ্যন্তরীণ সংকটের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক প্রভাব ও বহিরাগত ঝুঁকিও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতায় বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) থেকে উদ্ভূত নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টিও এখন থেকেই বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তিনি আরও সতর্ক করেন যে, আগামী নির্বাচনের পর দেশে নতুন ধরনের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ দেখা দিতে পারে, যা মোকাবিলায় রাজনৈতিক ঐক্য ও আধুনিক জ্ঞান অপরিহার্য।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ অভিযোগ করেন যে, বর্তমান সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ‘মব’ বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার কাছে নতজানু অবস্থানে রয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর পুলিশ ও আমলাতন্ত্রকে ঢেলে সাজানোর পরিবর্তে তাদের ঢালাওভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করায় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। তিনি সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আবেগ বর্জিত ও জাতীয় স্বার্থনির্ভর পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, অধ্যাপক ড. আবু সাঈদ বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ার সমালোচনা করে বলেন, এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বা জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নয়। নিরাপত্তা, জবাবদিহি এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত না হলে জনআস্থা আরও তলানিতে গিয়ে ঠেকবে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
গণফোরাম সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেন, সামরিক শাসন হোক কিংবা নির্বাচিত সরকার—কোনো আমলেই রাষ্ট্রের দমনমূলক চরিত্রের পরিবর্তন হয়নি। জুলাই বিপ্লবের পরও রাষ্ট্রীয় আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসায় তিনি হতাশা প্রকাশ করেন। বিজিবির উপস্থিতিতে সীমান্ত পারাপারের ঘটনা এবং পুলিশের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা ভবিষ্যতে নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
জাসদ প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মোশতাক হোসেন প্রশ্ন তোলেন যে, দেশের বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি কেবল উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের জন্য, নাকি সাধারণ মানুষের জন্য? বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জবাবদিহিতার অভাব এবং পুলিশ রিমান্ডকে ‘অবৈধ আয়ের হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহারের তীব্র সমালোচনা করেন।
সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের এই গুরুত্বপূর্ণ সংলাপে আরও বক্তব্য রাখেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারওয়ার মিলন, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আমসা আমিন, অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনিরুল ইসলাম আকন্দ, সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আলী আকবর এবং রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতা ইবনুল সায়েদ রানা প্রমুখ।
বক্তারা একমত হন যে, কেবল শাসক পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক অধিকারের নিশ্চয়তা দিলেই একটি সত্যিকারের গণতান্ত্রিক ও নিরাপদ রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব।

