দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে চলমান শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে এবার বড় ধরনের আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাবেক উপকমিশনার এবং অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো মো. হামিদুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। কমিশনের অনুসন্ধান অনুযায়ী, হামিদুল আলম, তার স্ত্রী এবং তিন বোনের নামে মোট ৬১ কোটি ১৯ লাখ টাকার জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
সোমবার (১২ জানুয়ারি) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের মহাপরিচালক আক্তার হোসেন এই মামলা সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কমিশনের অনুমোদনক্রমে মামলাগুলো রুজু করা হয়েছে।
প্রথম মামলাটির প্রধান আসামি করা হয়েছে হামিদুল আলমকে। এই মামলায় তার তিন বোন—মোছা. আজিজা সুলতানা, মোছা. আরেফা সালমা ও মোছা. শিরিন শবনমকেও সহযোগিতার অভিযোগে আসামি করা হয়েছে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হামিদুল আলম দুদকে দাখিলকৃত তার সম্পদ বিবরণীতে অসৎ উদ্দেশ্যে ২৭ কোটি ৬০ লাখ টাকারও বেশি মূল্যের সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। একইসাথে তদন্তে তার ৩৫ কোটি ১৭ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯৫ টাকা মূল্যের এমন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের সন্ধান মিলেছে, যার কোনো বৈধ উৎস তিনি দেখাতে পারেননি।
দুদকের অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে এসেছে যে, সরকারি পদে থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার করে অর্জিত অর্থ পাচারের উদ্দেশ্যে (লেয়ারিং) তিনি তার তিন বোনের নাম ব্যবহার করেছেন। বোনের নামে প্রায় ৮ কোটি ৯৪ লাখ ৬৪ হাজার টাকার স্থাবর সম্পত্তি অর্জন করে তার প্রকৃত উৎস আড়াল করার চেষ্টা করেছেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি সরাসরি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের পরিপন্থী।
দ্বিতীয় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে হামিদুল আলমের স্ত্রী মোছা. শাহাজাদী আলম লিপির বিরুদ্ধে, যেখানে হামিদুল আলমকেও সহযোগী আসামি করা হয়েছে। এই মামলার এজাহার অনুযায়ী, শাহাজাদী আলম লিপি তার সম্পদ বিবরণীতে ১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকার অধিক সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, স্বামীর অবৈধ উপার্জনের সহায়তায় তিনি ২৬ কোটি ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৯৭ টাকার জ্ঞাত-আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও তার নামে ৩ কোটি ৭৪ লাখ ৪২ হাজার টাকার সম্পদ পাওয়া গেছে, যার মূল উৎস হলো হামিদুল আলমের দুর্নীতি ও ঘুষের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ।
আসামিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২, দণ্ডবিধি এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। সংবাদ সম্মেলনে মহাপরিচালক আক্তার হোসেন স্পষ্ট করেন যে, সরকারি কর্মচারী হিসেবে অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা জনস্বার্থ বিঘ্নিত করেছেন এবং অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। এই মামলার পরবর্তী ধাপ হিসেবে অতি শীঘ্রই আসামিদের স্থাবর সম্পত্তি ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে কমিশন সূত্রে জানা গেছে।
বিগত কয়েক বছরে পুলিশ প্রশাসনের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির এমন গুরুতর অভিযোগ জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক স্বচ্ছতা মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রশাসনের উচ্চস্তরে এমন শুদ্ধি অভিযান সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

