আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের হলফনামা ও সম্পদের হিসাব নিয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, নির্বাচনী হলফনামায় সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন এমন কোনো ব্যক্তিকে দেশের শাসক হিসেবে দেখতে চান না। রোববার (১১ জানুয়ারি) দুদকের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সংগঠন রিপোর্টার্স অ্যাগেইনস্ট করাপশন (র্যাক)-এর ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
দুদক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন তার বক্তব্যে রাজনৈতিক শুদ্ধাচারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি আলোচিত উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “আপনাদের মনে করিয়ে দিতে চাই, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হলফনামায় সম্পদের যে বিবরণী দিয়েছিলেন এবং বাস্তবে তার যে সম্পদের পরিমাণ পাওয়া গিয়েছিল, তার মধ্যে বিস্তর ব্যবধান ছিল। সেই সময় যদি দুর্নীতি দমন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশন যথাযথভাবে ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করত, তবে তখনই তার প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সেটি তখন ঘটেনি।” তিনি মনে করেন, অতীতের এই বিচ্যুতিগুলোই পরবর্তী সময়ে শাসনব্যবস্থায় বড় ধরণের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
নির্বাচনী হলফনামার তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে দুদক প্রধান সাংবাদিকদের সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ে আমাদের পক্ষে শত শত প্রার্থীর হলফনামার প্রতিটি তথ্য সূক্ষ্মভাবে যাচাই করা বেশ কঠিন। আপনারা যারা সাংবাদিক, আপনারা নিজেরাও একজন অনুসন্ধানকারী। কোনো প্রার্থীর সম্পদের বিষয়ে আপনাদের কাছে যদি কোনো সন্দেহজনক তথ্য থাকে, তবে তা দ্রুত আমাদের জানান। আমরা চাইব না হলফনামায় প্রদর্শিত হয়নি—এমন সম্পদের মালিক আগামী দিনে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারক হিসেবে আসুক।”
দুদক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন আরও জানান যে, বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রার্থীদের হলফনামা জনসমক্ষে প্রকাশিত হচ্ছে। এটি একটি ‘পাবলিক ডকুমেন্ট’, ফলে সাধারণ জনগণ ও সংবাদকর্মীরা অনায়াসেই তথ্যের সঠিকতা যাচাই করতে পারেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো প্রার্থীর হলফনামায় দৃশ্যমান অসংগতি বা অবৈধ সম্পদের উৎস পাওয়া যায়, তবে কমিশন তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করবে না। প্রয়োজনে কমিশনের অন্যান্য নিয়মিত কার্যক্রমের গতি কিছুটা কমিয়ে হলেও নির্বাচনের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হলফনামা যাচাইয়ের কাজকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সবার জন্য সুশাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাই দুদকের মূল লক্ষ্য। দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ নেতৃত্ব ছাড়া একটি উন্নত রাষ্ট্র গঠন সম্ভব নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবেন, তারা অবশ্যই ন্যায়নিষ্ঠ ও সৎ হবেন। ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের কল্যাণে কাজ করবেন—এমন নেতৃত্বই এখন জাতির কাম্য।
র্যাকের সভাপতি শাফি উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক তাবারুল হকের সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন দুদক কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী, কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ এবং সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম। অনুষ্ঠানে বক্তারা দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে গণমাধ্যম ও দুদকের পারস্পরিক সমন্বয়ের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।

